"গুল আহম্মদ খাঁর সেতু সংস্কার"
পুজোর ছুটি চলছে। কলেজের শাটার ডাউন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে, বাতাসে হালকা হিমেল আমেজ। অনেকক্ষণ ছাদে হাওয়া খাচ্ছি। ছাদ থেকেই দেখলাম গুল চাচা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো আর সখের খাটিয়াটাকে বারান্দায় নামিয়ে ভালোমতো আঁটসাঁট করে বসিয়ে নিল। তারপর আরাম কেদারা মানে খাটিয়ায় বসে পায়ের ওপর পা তুলে গুল চাচার দিব্যি সেই আয়েশ। ভাবলাম চাচার সাথে একটু মজা করে আসি। মানুষটাই তো অন্য লেবেলের। এবং করলাম তাই, সটান গুল চাচার দাওয়ায় গিয়ে হাজির হলাম।
হাতে একটা চুন দেওয়া পানের বোঁটা, পান অলরেডি মুখ-গহ্বরে, চাচা জাবর কাটছে। ঠোঁটটা যেন সর্বকালের জন্য লাল, মুখে এক গাদা দাড়ি—আর সেই দাড়ি দলিয়ে পাকিয়ে চাচা তখন এমন এক গল্প ফেঁদে বসেছে, যেন মহাশয় স্বয়ং মহাকাশ স্টেশন থেকে খবর আনছেন!
আমি কাছ ঘেঁষে দাঁড়াতেই চাচা যেন আরও চনমনে হয়ে উঠল। পিঠটা একটু সোজা করে বসলো, আর তার গলার স্বরে এক গাম্ভীর্য নিয়ে বললো, "আরে, তুই এলি? বোস, বোস! - বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। আমি চাচার বারান্দার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
"কি গুলচাচা, আজ কোনো কাজটাজ নাই নাকি ? -- কাস্টোমার নাই বুঝি !" যদিও আমি জানি যে বসে থাকা আর পাগলের মতো প্রলাপ বকাই ওর প্রধান কাজ -- তবু একটু মাস্কারা করে কথাটা বলেই ফেললাম।
এই গুলচাচার সম্বন্ধে একটু বলা দরকার। চাচার বয়স পঞ্চাশ তো হবেই, দেখেই বোঝা যায়। লম্বায় ছয় ফুট, এমনকি তার বেশিও হতে পারে। লালচে-দাড়ি, মিহিভাবে কামানো গোঁফ। ঘাড় অবধি ঝুলে থাকা লম্বা লম্বা কাঁচা-পাকা চুল। চোখে সুরমা সর্বক্ষণই লেগেই থাকে। লম্বা ভোঁতা একখানা নাক আর নাকের উপর গুটি বসন্তের দাগ স্পষ্ট বোঝা যায়।
সর্বদাই গুলচাচার গায়ে উগ্র আতরের গন্ধ। পোশাকের মধ্যে ঢিলেঢালা সাদা, সবুজ কিংবা ঘিয়ে রঙের কুর্তা-পাজামা ছাড়া আর কিছু পড়তে টরতে দেখিনি, তবে মাঝে মধ্যে ছাপা লুঙ্গি পড়তে দেখা যায়। একখানা মখমলের রুমাল সবসময়ই হাতে থাকে। মাঝেমধ্যে সবুজ রঙের একটা কাপড় মাথায় পাগড়ি মতো করে পড়ে থাকতে দেখেছি অনেকবার। বিয়ে থা করেননি। একাই থাকেন আর আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে কেউ কেউ কোলকাতায়, কেউ আবার লক্ষ্ণৌতে।
তিনি বংশ পরম্পরায় নাকি হাকিম। নিজেকে কবিরাজ বলে পরিচয় দিয়ে থাকে আর ওটাই নাকি তার পেশা। দূর-দুরান্ত থেকে ডাক আসে। মাঝে মাঝে তিনি সপ্তাহখানেকের মতো গায়েব হয়ে যায়, কোথায় যায় কেউ বলতে পারে না। গুলচাচাকে জিজ্ঞেস করলে সঠিকভাবে কিছু বলে না, তবে নানান আজগুবি গল্প ফাঁদে, বিশ্বাস না হলেও গল্পগুলো শুনে আমি অবাক হয়ে যায়।
আর তাছাড়া তেলপড়া, নুনপড়া, পানিপড়া এবং তাবীজ টাবীজও দিয়ে থাকে। দূর দূর থেকে নাকি লোক ছুটে আসে গুলচাচার কাছে। বাবুরবাগের দুচারজন ভক্তি দেখালেও বেশিরভাগ লোক কিন্তু তাঁকে সেরকম পাত্তা-টাত্তা দেয় না বললেই চলে। ঐ যে কি একটা প্রবাদ আছে না - গেঁয়ো যোগী ভিখ পাই না, ব্যাপারটা খানিকটা ওরকমই।
তবে সত্যি সত্যিই নিজের চোখে বহু অচেনা-অজানা লোকেদের ভিড় করতে দেখেছি তাঁর ডেরায়। ডেরা বলতে ছোট্ট একটি দু-কামরাওয়ালা মুঘল আমলের পুরোনো জীর্ণ একটা পাকা দালানঘর। চুন সুড়কি খসে পড়েছে, ইটগুলো কোনোরকম টিকে আছে তবে এই ধ্বসে পড়ল বলে। আরো অনেকগুলো ঘর লম্বা একসারিতে আছে -- সবই মসজিদের আন্ডারে, সবগুলো রেন্টে দেওয়া রয়েছে। তবে গুলচাচা কোনো ভাড়া টাড়া দেয় না।
গুলচাচার কথা অনুযায়ী তার পূর্ব পুরুষরা ছিলেন বর্ধমানের রাজাদের রাজকীয় হাকিম এবং কবিরাজ। রাজার মন্ত্রীদের সাথেও নাকি শলা-পরামর্শ করতেন - এমনই রুতওয়া ছিল বাপ-দাদোদের। সবই গুলচাচার মুখেই শোনা, অন্যদের জিজ্ঞেস করেছি তবে কেউ সঠিকভাবে কিছুই বলতে পারে না। আবার কেউ কেউ বলে, ও ব্যাটা পাগলা, খালি গুল্ মারে। ব্যাটার নামেও গুল্...আর কাজেও গুল্...।
পুরো বাবুরবাগটা নাকি খয়রাতি হিসেবে পেয়েছিল বর্ধমানের কোনো এক রাজার কাছ থেকে। তারপর ভারত স্বাধীন হলে পরে বেশিরভাগ জায়গা-জমি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে, বর্ধমান মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের নামে আর বাকিটুকু বাবুরবাগ মসজিদের নামে খয়রাতি করে দেয়। এটাও সত্যি নাকি গুল্ তা বলতে পারবো না। এও গুলচাচার মুখেই শোনা কথা। এই হল গুল আহম্মদ খাঁর ইতিহাস।
আমার ঐ মাস্কারা করাটা বোধহয় গুলচাচার মোটেও ভালো লাগে নি। কারন গুলচাচা আমার দিকে স্থির পলকে এক ঝলক তাকিয়ে নিয়ে সড়াৎ করে মুখ ফিরিয়ে নিল তারপর আবার নিজের মনে বকতে লাগল।
"তোরা বেইমান! মানুষের কদর তোরা দিস্ না। বলেছিলি দু'লাখ টাকা দিবি, কই তোদের লাখ টাকা? তোদের পকেট তো ফাঁকা, দু'টাকা দেবার মুরদ নাই তোদের! আবার বড় বড় কথা! উঃ দেবেন বাবুরা লাখ! যত সব ঘাটের মরা, মর গে তোরা।"
এইসব বানচাল কথাগুলো বলে গুলচাচা কিছুক্ষণ চুপ মেরে বসে থাকল। তারপর লুঙ্গির ভাঁজ খুলে বিড়ির প্যাকেট আর দেশলাই ঠোল বের করল। একখানা বিড়ি ধরিয়ে ফোঁস ফোঁস করে দুটান দিয়ে আবার বলতে লাগল,
"কাল যদি আমি না থাকতাম, তবে গোটা রাজ্যে, এমনকি সারা দেশে হৈচৈ পড়ে যেত! বুঝিস না কিছু, শুধু আজেবাজে বকতে পারিস!"
গুল চাচা যখন এসব বলছে, তখন তার সেই ভরাট গলায় কোনো দ্বিধা নেই, যেন সত্যি সত্যিই দেশের অর্ধেক ভার তার কাঁধেই আছে। তবে চাচা কার বা কাদের কথা বলছেন তা কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। কি হয়েছিল গতকাল? আর তাছাড়া দুই লাখ টাকার ব্যাপারটা আমাকে খুব অবাক করল।
পাগলরা উল্টোপাল্টা কথা বলে যেসব কথার মধ্যে কোনো মিল থাকে না। শব্দের সাথে শব্দের মিল থাকে না। বাক্যের সাথে বাক্যের অজস্র গড়মিল থাকে। কিন্তু গুলচাচার শব্দে-বাক্যে এমনকি পদ-বাচ্য-সমাস-ক্রিয়া-কারক সবেই আশ্চর্য্যরকম মিল বজায় থাকে। তাই লোকে আর যাই বলুক না কেন আমি গুলচাচাকে পাগল ভাবতে নারাজ।
আমি একদৃষ্টে গুল চাচার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার ফর্সা, রোগা গাল ঢোকা মুখটা রাগে আরও লাল হয়ে উঠেছে। সর্বক্ষণ পানসুপুরি চিবিয়েই চলেছে, আর তার হাতের ইশারায় মনে হচ্ছে যেন সে সত্যিই কোনো বড় হিসাব নিকাশ মেলাতে ব্যস্ত। তার ওই 'দু'লাখ টাকা'র দাবির আড়ালে আসলে কী আছে? হয়তো কোনো পুরনো কাজের অসম্পূর্ণ পাওনা, অথবা হয়তো পুরোটাই তার মনের কল্পনা। কিন্তু তার রাগের কারণটা যে নিছক অহেতুক নয়, বরং পকেট ফাঁকা হওয়ার একটা করুণ যন্ত্রণা—সেটা তার চোখের চাউনিতেই স্পষ্ট।
আমি চুপচাপ তাকিয়ে আছি দেখে গুল চাচা যেন আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠলো। তার সেই আরাম কেদারা থেকে একটু নড়েচড়ে বসলো, সবুজ পাঞ্জাবির কলারটা ঠিক করলো, আর ঝিঁঝিপোকা ডাকার সন্ধ্যায় গলার স্বর আরও চড়িয়ে বললো,
"কী দেখছিস ওভাবে? ভাবছিস গুল চাচা মিথ্যে বলছে? শোন, আমার মতো মানুষের কদর না করলে তোদের মতো ঘাটের মরাদের তো গোল্লায় যাওয়াই দস্তুর!"
আমি বললুম, "ব্যাপারখানা একটু খুলে বলবে? নিজের মনে গালাগাল দিলে হবে! আমাকে বলো, যদি কিছু হেল্পটেল্প করতে পারি।"
গুলচাচা আবার আমার দিকে আগের মতন এক পলক দেখে মুখ ফিরিয়ে নিল। এইবার কিন্তু বিড়বিড় করে না বকে চুপ করে কি যেন ভাবতে লাগল।
আমি একটু ছন্দ কেটে বললাম,
"চাচা বলেন দেখি ব্যাপার খানা,
বুঝেছি চার আনা ;
পুরোটা হয় নাই জানা,
বলেন দেখি ষোলো আনা।"
এইভাবে ছন্দ কেটে বলাতে গুল চাচা আনন্দে একেবারে মাতোয়ারা হয়ে গেল। ফ্যাল ফ্যাল করে আমাকে দেখতে লাগল আর মুচকিয়ে হাসতে থাকল। বুঝতে পারলাম এবার পুরো বিষয়টা জানা যাবে বলে মনে হচ্ছে।
ইঙ্গিতে গুলচাচা আমাকে পাশে বসতে বলল। চাচা তার স্বভাবসিদ্ধ গাম্ভীর্য নিয়ে শুরু করল গতরাত্রে ঘটে যাওয়া রোমাঞ্চকর বর্ণনা। চাচা বলল,
"রাত তখন কাঁটায় কাঁটায় বারোটা। গুমোট গরম, আমি ছাদে ওই ছেঁড়া মশারিটার ভেতর হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমে কাদা। হঠাৎ মশারির ফুটো দিয়ে একটা জোরালো টর্চের আলো সোজা এসে পড়ল আমার চোখে। চোখ কচকে ভাবলুম, শালা চোর নাকি রে? মশারিটা সামান্য তুলে যেই না তাকালুম—দুটো কালো মূর্তি! আমার তো পিলে চমকে যাওয়ার জোগাড়!
দেখলুম, মশারির বাইরে ঘামে জবজব করে দাঁড়িয়ে আছেন পুলিশ কমিশনার বি. সি. সাইগল সাহেব আর ওনার পাশে স্যুট-বুট পরা জেলাশাসক (DM)। সাইগল সাহেবের কাঁধের মেডেলগুলো চাঁদের আলোয় চকচক করছে ঠিকই, কিন্তু ওনার মুখের চেহারাটা তখন একটা পাতিলেবুর মতো চুপসে গেছে! আর ডিএম সাহেব? ওনার হাতের দামি চামড়ার ফাইলটা থরথর করে কাঁপছে, যেন খবরের কাগজের ঠোঙা!
আমি উঠে বসার আগেই ডিএম সাহেব প্রায় নিজের মাথাটা ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন! কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন: ‘গুল আহম্মদ জনাব! দোহাই আপনার, আমাদের বাঁচান! এই মাঝরাতে আপনার পায়ের ধুলো না পড়লে কাল সকালের সূর্য আর কলকাতা শহর দেখতে পাবে না!’
আমি তো তখনো ভাবছি ওনারা হয়তো আমার ঘরে বেআইনি চোলাই মদের তল্লাশিতে এসেছেন! আমি তড়াক করে উঠে একটু কড়া সুরে বললুম—‘কী হয়েছে বলুন তো? মাঝরাতে মশারির ভেতর মাথা গলিয়ে দিয়েছেন কেন? আমার অপরাধটা কী?’
আমার ওই ভরাট গলার হুঙ্কারে ছাদের টিনের চালটা সামান্য কেঁপে উঠল। আর যায় কোথায়! ডিএম সাহেব এমনিতেই ভয়ে আধমরা হয়েছিলেন, আমার গলার গম্ভীর আওয়াজে উনি এমন ভিরমি খেলেন যে সোজা পেছনের দিকে উল্টে যাচ্ছিলেন! ভাগ্যিস সাইগল সাহেব পেছন থেকে ওনার কোমরটা জাপটে ধরলেন, নইলে ছাদ থেকে সোজা নিচে পড়ে ওখানেই ‘পাট্টা’ হয়ে যেতেন!"
নিচে পড়ে যাওয়ার ভয় সামলে ডিএম সাহেব এবার একেবারে মশারির খুঁটিটা ধরে ঝুলে পড়লেন। বললেন: ‘জনাব, ভুল হয়ে গেছে! আমরা অতি ক্ষুদ্র জীব। মুখ্যমন্ত্রীর খাস আদেশ নিয়ে সরাসরি আপনার ছাদে ল্যান্ড করেছি। হাওড়া ব্রিজের অবস্থা কেরোসিন! ওখানকার সব মেইন টাওয়ারের গাসেট প্লেট আর স্টিলের রিভেট নাকি চাড় খেয়ে চরম আলগা হয়ে গেছে। গোটা বিশ্বের তাবড় তাবড় ইঞ্জিনিয়াররা ব্রিজের তলায় হাতুড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কোনো কুলকিনারা পাচ্ছে না!’
আমি একটু ভাব নেওয়ার জন্য গম্ভীর হয়ে বললুম—‘উঁহু! আমি এখন সরকারি ডিউটি করি না। তাছাড়া এখন ঘুমানোর সময়। আপনারা অন্য ডাক্তার দেখান গে!’
ব্যস! এই কথা শোনা মাত্রই পুলিশ কমিশনার সাইগল সাহেব ওনার মাথার মস্ত বড় টুপিটা বগলদাবা করলেন। তারপর ওনার চকচকে ভারী বুট জুতো জোড়া সমেত হাঁটু গেড়ে বসলেন আমার খাটিয়ার পাশে! মশারির জালিটা নিজের গাল দিয়ে ঘষতে ঘষতে বলতে লাগলেন:
‘গুলদা! আপনার পায়ে পড়ি, এমন কথা বলবেন না! আমাদের চাকরিটা বাঁচান! হাওড়া ব্রিজের সেন্ট্রাল হিঞ্জিং রিভেটগুলো নাকি থার্মাল শকে খসে পড়ছে! কাল সকালে যদি ব্রিজ ভেঙে পড়ে, তবে মুখ্যমন্ত্রী আমাদের দুজনকে দিয়ে গঙ্গার জল ছেঁচাবেন! আপনি যা চাইবেন তাই দেব। এক লাখ, দু’লাখ টাকা? ও তো সামান্য জিনিস, দরকার হলে খোদ ব্যাঙ্কের চাবি আপনার কোমরে ঝুলিয়ে দেব! শুধু একবার চলুন!’
ডিএম সাহেব তখনো কাঁপছেন। তিনি পকেট থেকে ওনার রেশমি রুমালটা বের করে আমার হাত দুটো চেপে ধরলেন। ওনার চোখের কোণে তখন চিকচিক করছে জল! বললেন: ‘জনাব, আপনার পায়ে পড়ি! আপনি না গেলে কাল সকালে ওদিকের ট্রাফিকের সাথে সাথে আমাদের চাকরিটাও গঙ্গায় ভেসে যাবে। আপনি যা চাইবেন, আমরা তাই দেব। শুধু দয়া করে আমাদের সাথে চলুন!’"
তিনি আরও কাকুতিমিনতি করতে লাগলেন, ‘জনাব, আপনি না গেলে আমি এই ছাদ থেকে খালে ঝাঁপ দেব! দেশের ইজ্জতের সওয়াল, গুলদা!’
"আমি দেখলুম, আহা! দেশের অত বড় বড় অফিসাররা মশারির ভেতর মাথা গলিয়ে এভাবে কান্নাকাটি করছে, দেখতে কেমন দেখায়! আমার আবার মনটা বড্ড নরম রে পাগলা।
দেশের এই মহাবিপদে গুল আহম্মদ আর ঘরে বসে থাকতে পারে না। আমি বুক ফুলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললুম—‘ঠিক আছে, ঠিক আছে! কেঁদো না বাপু, কেঁদো না। ওই সাইগল সাহেবকে বলো আমার পাঞ্জাবিটা আলনা থেকে পেড়ে দিতে। আর শোনো, ওখানে এক কৌটো খাঁটি চুন আর গোটা চারেক কড়া সুপুরিসমেত পানের ডিব্বা রাখা আছে, ওটাও যেন নিতে না ভুলে যান।’
ডিএম সাহেব তখন যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন! সাইগল সাহেব নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আমার পাঞ্জাবির হাতা দুটো ঠিক করে দিলেন, আর ডিএম সাহেব ওনার দামি ফাইলটা দিয়ে আমার মশারির ভিতর হাওয়া করতে লাগলেন!
আমি আয়েশ করে খাটিয়া থেকে নামলুম, আর ওনারা দুজনে আমার চটি জোড়া সোজা করে আমার পায়ের সামনে রাখলেন। একেই বলে সত্যিকারের কদর, বুঝলি?"
গুল চাচা একগাল হেসে আবার পা নাড়াতে শুরু করলেন। ওনার মুখের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, সাইগল সাহেব আর ডিএম সাহেব যেন এখনও ওনার পায়ের কাছেই বসে হাওয়া করছেন!
তখন আমি একটু মজা করে বললুম, "তোমাকে নিয়ে যেতে নিশ্চয় স্পেশাল হেলিকপ্টার পাঠিয়েছিলেন মন্ত্রিমশাই!"
গুল চাচার চোখ দুটো এবার যেন উত্তেজনায় ঠিকরে বেরোতে চাইল! এতক্ষণ দাওয়ায় বসে যে গল্পটা তিনি একটু ধীরেসুস্থে বলছিলেন, হেলিকপ্টারের প্রসঙ্গ আসতেই ওনার হাত-পা নাড়ার গতি দ্বিগুণ হয়ে গেল। খাটিয়া থেকে আবার একটু ঝুঁকে, গলার স্বরটা একদম ফিসফিসানি থেকে এক ধাক্কায় কর্কশ রেডিওর মতো করে বললেন:
"আরে! তুই তো দেখছি আসল রোমাঞ্চটাই ধরে ফেলেছিস! আমি তো তোকে খাটো করে শুধু ছাদের মশারির কথা বলেছিলুম। কিন্তু আমার মাথার উপর দিব্যি ওই সাউন্ডপ্রুফ হেলিকপ্টার ভেসে থাকার সিনটা না শুনলে তোর এই ষোলোআনা গল্পটাই মাটি!"
চাচা ওনার সবুজ পাঞ্জাবির হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিয়ে শুরু করলেন মাঝরাতের সেই মারাত্মক মজাদার সাউন্ডপ্রুফ হেলিকপ্টার অভিযান:
"আগেই বলেছি রাত তখন ঠিক বারোটা। চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঘটনাস্থলে যাওয়ার জন্য আমি একদম রেডি কিন্তু বর্ধমান থেকে হাওড়া দুইতিন ঘন্টার রাস্তা। পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় ভোর হয়ে যাবে।
আমার আবদার করার আগেই দেখলাম সাইগল সাহেব ওয়াকিটকিতে কিসব আওড়ানোর পর দুবার 'ওভার ওভার' বলে উঠলেন। ঠিক তারপরেই ছাদের ওপর থেকে লাল-নীল-সবুজ বাতির ছটা চোখে এসে পড়ল।
আমি কোনোমতে লুঙ্গিটা শক্ত করে গিঁট দিয়ে মশারির বাইরে মাথা গলিয়ে দেখলুম—আরে বাপরে! খোদ গভর্নমেন্টের একটা পেল্লাই সাইজের ডবল-পাখাওয়ালা হেলিকপ্টার আমার ছাদের ঠিক ওপরে শূন্যে ভেসে রয়েছে! ওখান থেকে একটা দড়ির মই সাঁ করে নেমে এল আমার ছাদের আলসের ওপর।
হেলিকপ্টারের খোলা দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে কেউ একজন বলে উঠল, ‘কাম...অন, কাম...অন স্যার...!’ পুলিশ কমিশনার বি. সি. সাইগল সাহেব বললেন, ‘চলুন জনাব, যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।’ সবার আগে সাইগল সাহেব মই বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে গেলেন। আমিও রেডি হয়ে সটান মই ধরে উঠতে লাগলাম। আমার পেছনে ডি. এম. সাহেব ভয়ে ভয়ে উঠতে শুরু করলেন। জবরজং স্যুট-বুট পরা ডিএম সাহেব যেনতেন প্রকারে হেলিকপ্টার অবধি পৌছোলেন ঠিকই, কিন্তু ঘাবড়ে গিয়ে সিটবেল্ট ভালো করে আঁটতেই ভুলে গেলেন। ফলে হেলিকপ্টার যেই না একটু কাত হয়েছে অমনি ডি. এম. সাহেবের ভয়ানক আর্তনাদ। আর একটু হলেই তিনি সোজা খালে। কিন্তু পলক ঝপকানোর আগেই আমি খপাত করে বাঁহাতে ওনার কোমরের বেল্টসমেত প্যান্ট টাকে আঁকড়ে ধরলাম, তারপর সোজা টেনে হেলিকপ্টারের সিটে বসালাম। এ যাত্রায় রক্ষা পেলেন ডি. এম. সাহেব।
ওই ঘূর্ণায়মান পাখার হাওয়ায় চুল উড়িয়ে হেলিকপ্টারের সিটে বসে আমি পকেট থেকে সুপুরিটা বের করে ডিএম সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললুম, ‘আরে বাবু, অত ঘামছ কেন? ইস্পাত তো ইস্পাতের জায়গায় থাকবে, তোমরা আগে নিজেদের কলিজাটা ঠান্ডা করো!’"
গুল চাচা গল্পটা শেষ করে ওনার সবুজ পাঞ্জাবির কলারটা এমনভাবে ঝাড়লেন, যেন তিনি আসলেই এইমাত্র হেলিকপ্টার থেকে নেমে এলেন।
আমি ওনার দিকে তাকিয়ে বললুম, "অসাধারণ চাচা! মাঝরাতে আমাদের গুল চাচাকে সাউন্ডপ্রুফ হেলিকপ্টারে তুলতে খোদ কমিশনার আর ডি. এম.-এর এই কাকুতি-মিনতি! এর চেয়ে জমজমাট এন্ট্রি আর হতেই পারে না!"
তারপর গুলচাচা আর যা যা বলল তা ঠিক এরকম:
রাত ১টা কি দেড় টা হবে। গোটা কলকাতা যখন ঘুমে, হাওড়া ব্রিজের কন্ট্রোল রুমে তখন পিনপতন নিস্তব্ধতা। বড় বড় স্ক্রিনে ব্রিজের খুঁটিনাটি দেখা যাচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী নিজে ভিডিও কনফারেন্সে উপস্থিত। তার পাশে পুলিশ কমিশনার বি. সি. সাইগল এবং জেলাশাসক। সবার চোখেমুখে চরম আতঙ্ক।
ঠিক তখনই কন্ট্রোল রুমের দরজা খুলে এক আজব ভঙ্গিতে প্রবেশ করল গুল চাচা। পরনে সেই ঢিলেঢালা পাঞ্জাবি, হাতে ধরা একটি পান, আর মুখে একগাল গোল হাসি—যেন কোনো প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছে!
তাকে দেখেই মুখ্যমন্ত্রী বিরক্ত হয়ে বললেন, "ইনি? ইনি কী করবেন?"
জেলাশাসক আমতা আমতা করে বললেন, "মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মহাশয়, ইনিই হলেন সেই গুল আহম্মদ খাঁ। ওনার 'থিওরিটিক্যাল এ্যান্ড প্র্যাকটিক্যাল' জ্ঞান নাকি অসামান্য।"
মুখ্যমন্ত্রী মহাশয় বললেন, "আই এম ভেরি সরি মিঃ গুল্! আপনাকে চিনতে পারিনি।"
গুল চাচা এগিয়ে এসে চেয়ারে বসলেন। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে পানের পিক ফেলে বললেন, "কী হয়েছে? এত টেনশন কেন? আরে, এই ব্রিজ তো আমার হাতের তালুর মতো!"
একজন ইঞ্জিনিয়ার এসে আতঙ্কিত স্বরে বললেন, "স্যার, টেরোরিস্টরা মেইন স্টিল আর্চের একটা বিশেষ 'কিং-পিন রিভেট' (Kingpin Rivet) পোর্টেবল লেজার দিয়ে গলিয়ে আলগা করে দিয়ে পালিয়েছে! যার ফলে পুরো ব্রিজের লোড-ব্যালেন্স বিগড়ে গেছে। কিন্তু কোথায় সেই সূক্ষ্ম ফাটল আর কোন রিভেটটা তৈরি করছে এই ডেঞ্জার, বিজ্ঞানের কোনো ডিজিটাল সেন্সরও ধরতে পারছে না! হাতে সময় খুবই কম। কাল সকালের ট্রাফিকে ব্রিজটা নিশ্চয় ভেঙে পড়বে! অজস্র মানুষের জীবনহানি হবে, দেশের সম্মানহানি, আবার কোটি কোটি টাকার ক্ষতি!"
সবাই চুপ। সবাই জানে, হাওড়া ব্রিজে তো কোনো স্ক্রু বা নাট-বল্টুর গল্প নেই! পুরোটা ১০ কোটি লাল-গরম রিভেট দিয়ে শক্ত করে জোড়া। এখন রাতারাতি নতুন করে কামারশালা বসিয়ে রিভেট পিটিয়ে বসানোর মতো সময় কারও হাতে নেই!
গুল চাচা হো হো করে হেসে উঠলেন। "ব্যাস! এইটুকু ব্যাপার? আরে, এটা কোনো ত্রুটি নয়, এটা ব্রিজের একটা 'অ্যাকুপ্রেশার পয়েন্ট'! আমি ছোটবেলায় যখন গঙ্গার হাওয়ায় এই ব্রিজের মেকানিজম্ নিয়ে গবেষণা করতাম..."
মুখ্যমন্ত্রী ধমক দিয়ে বললেন, "এখন গবেষণা করার সময় নেই বাপু! আপনি কী করবেন বলুন।"
গুল চাচা পকেট থেকে একটা পুরনো, মরচে ধরা চাবি বের করল। রহস্যময় হাসি হেসে বলল, "সবাই চুপ। কোনো ভারী ওয়েল্ডিং মেশিন লাগবে না। আমার এই বিশেষ চাবি আর আমার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিই যথেষ্ট। আসল সমস্যা রিভেট গলে যাওয়া নয়, আসল সমস্যা হলো 'শব্দ ও তাপের ভারসাম্য'!"
হাওড়া ব্রিজের কন্ট্রোল রুমের সেই মুহূর্তটি যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী, পুলিশ কমিশনার বি. সি. সাইগল এবং জেলাশাসক—সবাই রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছেন গুল চাচার দিকে। গুল চাচা ততক্ষণে পাঞ্জাবির হাত গুটিয়ে নিয়েছে। তার চোখেমুখে কোনো ভয় নেই, বরং এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস।
চাচা দুই হাঁটুতে হাত দিয়ে ঝুঁকে বসলেন, তারপর শুরু করলেন ওনার সেই কালজয়ী হাওড়া ব্রিজ উদ্ধারের আসল রোমহর্ষক বিবরণ:
"শোন, কন্ট্রোল রুমের ওই বিশাল স্ক্রিনে যখন লাল আলোটা দপ দপ করছে, আর মস্ত বড় কম্পিউটারগুলো ‘বিপ বিপ’ করে সাইরেন বাজাচ্ছে, তখন চিফ ইঞ্জিনিয়ার সাহেব কপাল ঘামতে ঘামতে আমায় বললেন, ‘জনাব, কম্পিউটার তো খালি দেখাচ্ছে ডেনজার জোন, কিন্তু কোন রিভেটটা ঢিলে হয়েছে তা তো হাতুড়ি পিটিয়েও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!’
আমি স্ক্রিনের দিকে এক নজর তাকালুম। ব্রিজে তখন লাখ লাখ রিভেটের মাথা যেন আকাশের তারার মতো জ্বলজ্বল করছে। আমি বললুম, ‘আরে বাবু, মাথাটা খাটাও! ইস্পাত হলো জীবন্ত জিনিস। দিনের রোদে ওটা বাড়ে, রাতের ঠাণ্ডায় ওটা কমে। তোমরা খুঁজছ কম্পিউটার দিয়ে, আর আমি খুঁজব কান দিয়ে!’
মুখ্যমন্ত্রী অবাক হয়ে বললেন, ‘কান দিয়ে মানে?’
আমি বললুম, ‘হাওড়া ব্রিজের তলা দিয়ে যখন গঙ্গার হাওয়া বয়, তখন প্রত্যেকটা জোড় থেকে একটা সুর বেরোয়। যদি সব রিভেট টাইট থাকে, তবে সেই সুরটা হয়—"ঝুন ঝুন"। আর যদি একটাও রিভেটের মাথায় ফাঁক থাকে, তবে গঙ্গার হাওয়ায় লোহা কাঁপবে আর আওয়াজ হবে—"খট খট"!’
সবাই তখন হাঁ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে! আমি কানের পেছনে হাত দিয়ে স্ক্রিনের স্পিকারের আওয়াজটা শুনতে বললুম। ঠিক যেন তবলার বোল! কিছুক্ষণ শোনার পর আমি চেঁচিয়ে উঠলুম—‘পেয়ে গেছি! চার নম্বর পিলারের বাঁদিকের তিন নম্বর আর্চের গোড়ায় গলদ! ওখানে সুরটা "খট খট" করছে!’"
"কিন্তু আসল খেলা তো তখনো বাকি! আমরা যখন লিফটে করে ওপরে উঠলুম, তখন গঙ্গাবক্ষের হাওয়ায় যেন আমাদের উড়িয়ে নিয়ে যাবে! চিফ ইঞ্জিনিয়ার সাহেব কেঁদেই ফেললেন, ‘জনাব, স্পট তো ঠিক ধরেছেন, কিন্তু এই জখম হওয়া লাল-গরম রিভেট আবার সিল করার মতো মাঝরাতে কামারশালা বা বিশাল স্পট-ওয়েল্ডিং প্লান্ট কোথায় পাব? সকাল হয়ে যাবে!’
আমি বললুম, ‘চোপ! তোরা হলি থিওরি বুক-এর পোকা! তোরা পড়েছিস লোহা জোড়া দিতে লোহাই গালতে হয়। কিন্তু বিজ্ঞানের একটা চরম নিয়ম আছে—"চুন-সুপারির থার্মাল কেমিস্ট্রি"!’
আমি কী করলুম জানিস? পকেট থেকে পানের কৌটোটা বের করলুম।
১. প্রথম ধাপ: কৌটো থেকে এক খাবলা খাঁটি ভেজা চুন বের করলুম। চুন যখন জলের সংস্পর্শে আসে, তখন ওটা প্রচণ্ড তাপ (Exothermic reaction) তৈরি করে।
২. দ্বিতীয় ধাপ: সেই চুন আমি ওই ফাঁকা হয়ে যাওয়া রিভেটের খাঁজে লেপে দিলুম। আর ওপর থেকে আমার পকেটের সেই মরচে ধরা আলমারির চাবির ডগা দিয়ে চুনটাকে এমন জোরে ঠুকালুম যে ভেতরে একটা বায়ুশূন্য ভ্যাকুয়াম (Vacuum) তৈরি হলো।
৩. তৃতীয় ধাপ: চুনের তাপে আর আমার ওই মরচে ধরা লোহার চাবির ঘর্ষণে এক অদ্ভুত রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটল। মুহূর্তের মধ্যে সেই আলগা হয়ে যাওয়া রিভেটের লোহা আবার গলতে শুরু করল এবং আমার চাবির সুক্ষ্ম চাপে নিজে থেকেই সিল হয়ে গেল! ঠিক যেন বায়োলজিক্যাল স্পট ওয়েল্ডিং!"
"ঠিক সেই মুহূর্তে—যেন সিনেমার কোনো ক্লাইম্যাক্স—ঘটলো আর এক চরম বিপর্যয়! ওই টেররিস্টগুলো শুধু একটা রিভেট আলগা করেনি, ওখানকার একটা মস্ত বড় 'গাসেট প্লেট' (Gusset Plate - যা ব্রিজের শত শত লোহার বিমকে একসাথে ধরে রাখে) সেই প্লেটের মূল জোড়টাকে একটা সাইলেন্সার লাগানো হাইড্রোলিক জ্যাক দিয়ে সামান্য চাড় দিয়ে রেখেছিল!
হাওয়ার চাপে সেই লোহার পাতটা থেকে হঠাৎ একটা বিকট শব্দ উঠল—'ক্র্যাঁআআচ!'
কন্ট্রোল রুমের স্পিকারে তখন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর চিৎকারের আওয়াজ—‘জনাব! ব্রিজের পশ্চিম দিকের ভারসাম্য পুরোপুরি বিগড়ে যাচ্ছে! স্প্যানটা এখনই কাত হয়ে গঙ্গায় পড়ে যাবে!’
চিফ ইঞ্জিনিয়ারের হাত থেকে তখন ওয়াকিটকি খসে মাটিতে পড়ে গেল। উনি বললেন, ‘সর্বনাশ হয়েছে! ওটা ১০ টন চাপের স্টিল প্লেট। ওটাকে সোজা করে আগের জায়গায় না বসালে পুরো জোড়টাই খসে যাবে। কিন্তু এই মাঝরাতে ওই মরণফাঁদে দাঁড়িয়ে কে ওই লোহার পাত সোজা করবে? আর কী দিয়েই বা করবে?’"
তারপর এল "গুল আহম্মদের ‘বায়ো-মেকানিক্যাল’ থিওরি"।
"আমি দেখলুম আর সময় নেই। পকেট থেকে একটা কাঁচা সুপারি বের করলুম। ওটা কিন্তু সাধারণ সুপারি নয়, একদম জাঁতি দিয়ে কুচানো শক্ত ছাল-সমেত সুপারি!
আমি ওই গাসেট প্লেটের ঠিক সেই সংযোগস্থলে গেলুম যেখানে চাপটা সবচেয়ে বেশি। সেই লোহার পাতের সূক্ষ্ম ফাঁটলটার মুখে সুপুরির কুচিটা ঢুকিয়ে দিলুম। তারপর আমার ওই মরচে ধরা চাবির চ্যাপ্টা দিকটা সুপুরির ওপর রেখে, ওপর থেকে নিজের কনুই দিয়ে এমন এক মোক্ষম আড়-ধাক্কা মারলুম যেটাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে 'ফলক্রাম লিভারেজ' (Fulcrum Leverage)!
তুই বিশ্বাস করবি না, ওই কাঁচা সুপুরির ছাল আর স্টার্চ যখন লোহার প্রচণ্ড চাপে পিষে গেল, তখন ওটা একটা জৈব-আঠা বা 'বায়ো-সিমেন্ট'-এর মতো কাজ করতে শুরু করল। ওদিকে চুন আর লোহার তাপ তো ছিলই, তার সাথে সুপুরির কষ মিশে এক অতি-মানবিক রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটল!
লোহার প্লেটটা যখন গরম হয়ে প্রসারিত হতে চাইল, ওই সুপুরির কষের রাসায়নিক বন্ধন তাকে উল্টোদিকে টানল। একটা অদ্ভুত শব্দ হলো—'ঝননন!'
মুহূর্তের মধ্যে সেই দশ টনের স্টিল প্লেট সোজা হয়ে নিজের জায়গায় জ্যাম হয়ে আটকে গেল! একেবারে লক!"
"কন্ট্রোল রুমের সমস্ত লাল বাতি এক লহমায় সবুজ হয়ে গেল! মনিটরের গ্রাফে ব্রিজের স্থায়িত্ব এক লাফে ১০০% ছুঁয়ে ফেলল।
ভিডিও কনফারেন্সে মুখ্যমন্ত্রী তখন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছেন! পুলিশ কমিশনার সাইগল সাহেব তো ওখানেই ওনার টুপিটা খুলে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন আর চিৎকার করে উঠলেন—‘স্যালুট জনাব! স্যালুট!’
আমি শান্তভাবে কপালে জমা ঘামটুকু সবুজ পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে মুছলুম। তারপর পকেটের কৌটো থেকে শেষ পানটা মুখে পুরে বললুম: ‘বুঝলেন কমিশনার সাহেব? আপনাদের ভারী যন্ত্রপাতি যেখানে ফেল করে, সেখানে গুল আহম্মদের পকেটের চুন-সুপারি আর একটা মরচে ধরা চাবিই ইতিহাস বদলে দেয়! মনে রাখবেন, হাওড়া ব্রিজ শুধু স্টিলের জোরে দাঁড়িয়ে নেই, ওটা দাঁড়িয়ে আছে বাঙালির তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধির ওপর!’"
গুল চাচা এক গাল লাল হাসি হেসে এবার ধপাস করে খাটিয়ায় বসলেন। ওনার দাড়ি তখন গর্বে হাওয়ায় দুলছে।
আমি ওনার সামনে হাত জোড় করে বললুম, "ধন্য চাচা! রিভেট আর স্টিল প্লেটকে চুন আর সুপুরি দিয়ে তুমি যে জৈব-আঠা বানিয়ে হাওড়া ব্রিজকে চিরকালের মতো জোড়া লাগিয়ে দিলে, এ তো নোবেল প্রাইজ পাওয়ার মতো আবিষ্কার! ওই ডিএম-এসপি-রা তোমায় দু'লাখ টাকা নয়, পুরো নোবেল কমিটির কাছ থেকে কোটি টাকা পাইয়ে দেওয়ার যোগ্য ছিল!"
চাচা পা-টা আবার ওপরে তুলে আয়েশ করে দুলতে দুলতে বললেন, "ধুর ব্যাটা! নোবেল দিয়ে আমি কী করব? ওরা তো সব ঘাটের মরা! আমার এই খাটিয়া আর মুখের পানটাই ভালো।"
হাওড়া ব্রিজ বাঁচানোর পর গুল চাচার নামে চারদিকে জয়জয়কার হওয়ার কথা। কিন্তু গুল চাচা তাতে অমত। তিনি এইসব হৈহুল্লোড় একেবারেই পছন্দ করেন না। মুখ্য়মন্ত্রি মশাই তো মহাখুশি, তাঁর নির্দেশে জেলা শাসক সাহেব প্রায় আড়ালে আবডালে গুল চাচার হাতে একটা দু'লাখ টাকার একটি চেক তুলে দিলেন। গুল চাচা তখন নিজেকে যেন রাজ্যের সবথেকে বড় বীর মনে করছেন।
ব্যাংকে গিয়ে কাউন্টারে চেকটা জমা দিতেই ক্যাশিয়ার ভদ্রলোক চেকটা বারবার উল্টেপাল্টে দেখলেন। তারপর কেমন একটা বাঁকা হাসি হেসে বললেন, "গুল আহম্মদ বাবু, এই চেকটা তো ইনক্যাশ করা সম্ভব নয়।"
গুল চাচা দাপটের সাথে বললেন, "কী বলছেন? জেলাশাসক নিজে আমাকে এটা দিয়েছেন! আমার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ছাড়া আজ হাওড়া ব্রিজ থাকত না, আর আপনি বলছেন হবে না?"
ক্যাশিয়ার তখন গম্ভীর হয়ে উত্তর দিলেন, "আরে গুল দাদা, এটা কোনো ব্যাংক চেক নয়। এটা তো একটা ছাপানো কাগজ মাত্র! এতে কোনো সিল নেই, কোনো অথরাইজড সই নেই। এটা পুরোটাই জাল!"
মুহূর্তের মধ্যে গুল চাচার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেই সিস্টেমের কাল ইজ্জত বাঁচাল, আজ সেই ব্যবস্থার কাছেই সে প্রতারিত।
আমি যখন কথাটা শুনলাম, আমার বুকটা কেঁপে উঠল। গুল চাচার দিকে তাকিয়ে দেখি, সে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম, "চাচা, তুমি করলে কী? এত বড় একটা ভুল? জেলাশাসক তোমাকে আস্ত একটা চিরকুট গছিয়ে দিল আর তুমি সেটাকে চেক ভেবে ব্যাংকে নিয়ে গেলে? একবার কি ভালো করে পড়ে দেখলে না ওটা কিসের কাগজ?"
আমি তাকে বললাম, "এখন যদি তুমি এটার বিরুদ্ধে থানায় গিয়ে এফআইআর (FIR) করতে যাও, তাহলে হিতে বিপরীত হবে। ওদের বিরুদ্ধে—মানে ডিএম, পুলিশ কমিশনার, এমনকি মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস বা ক্ষমতা তোমার আছে কি? ওরাই তো পুরো সিস্টেমটা চালাচ্ছে। উল্টে ওরা তোমাকেই বলবে যে তুমি জালিয়াতি করেছ, বা তোমার উপর মানহানির (defamation) মামলা করবে। তুমি এখন এমন এক গোলকধাঁধায় আটকে গেছ, যেখানে সত্য বললেও তোমার জেল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তার চেয়ে বড় কথা, স্বাধীনতার লড়াইয়ের দাম কি আর ওই দু'লাখ টাকায় হয়?
চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "তোর কথাই ঠিকই মনে হচ্ছে। স্বাধীনতার লড়াইয়ের দাম কি আর এই দু'লাখ টাকা হয়? আমি ভেবেছিলাম দেশ বাঁচিয়েছি, তার পুরস্কার পাব। কিন্তু এরা তো আমাকেই বোকা বানিয়ে আমার সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিল।" শুধু ওই ডিএম ব্যাটা আমায় জাল চেকটা দিয়ে আমার থিওরিটার অপমান করল, এই যা দুঃখ!"
আমি বুঝলাম, চাচার মতো একজন 'গুল মারার ওস্তাদ' আজ নিজেই সিস্টেমের বড় এক 'গুল'-এর শিকার। ক্ষমতার এই খেলায় সত্য বা ন্যায়বিচারের কোনো জায়গা নেই।
আমি চাচার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে ওনার কাঁধে হাত রাখলাম। ওর সেই ফর্সা, রোগা গাল দুটো তখন অপমানে আর রাগে থমথম করছে। পানের রসটা গিলবে না ফেলবে, বুঝতে পারছে না। ওর সেই বংশানুক্রমিক হাকিমি অহংকারটা যেন সিস্টেমের একটা সামান্য কাগজের টুকরোর কাছে ধাক্কা খেয়েছে।
আমি বললাম, "তুমি হলে এই দেশের আনসাং হিরো। ক্যাশিয়ার ব্যাটা সাধারণ মানুষ, ও কী বুঝবে ওই কাগজের মাহাত্ম্য!"
আমার এই কথাগুলো শুনে গুল চাচা উগ্র আতরের গন্ধ ভরা মখমলের রুমালটা দিয়ে মুখটা একবার মুছে নিল। তারপর আবার সেই খাটিয়ায় পায়ের ওপর পা তুলল, সবুজ পাঞ্জাবির কলারটা আর একবার ঝেড়ে নিয়ে ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ফিরিয়ে আনল। দাড়িটা দুবার চুলকে বলল, "তুই ঠিকই বলেছিস। ওটা দু'লাখ টাকার চেক নয়, ওটা আসলে দেশের সুরক্ষার একটা টপ-সিক্রেট কোড! আমি তো জাস্ট পরীক্ষা করে দেখছিলাম ব্যাংকের লোকগুলোর কোনো বুদ্ধি আছে কি না। সব ব্যাটা ঘাটের মরা!"
আমিও মনে মনে হাসলাম। যাক, হাওড়া ব্রিজও বাঁচল, আর আমাদের গুল চাচার ইজ্জত আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিও বহাল তবিয়তে টিকে রইল!
লেখক - আলীম বাবু

No comments:
Post a Comment