বাংলা গল্পসল্প

"BanglaGolpoSolpo" is all about Bengali stories, Bengali Poems, Articles etc. 'বাংলা গল্পসল্প'র তরফ থেকে সকল পাঠকগণ, শ্রোতাগণ ও লেখকবন্ধুদের জানাই হার্দিক অভিনন্দন, ভালোবাসা, প্রীতি ও শুভেচ্ছা এবং শুভকামনা। এই অনলাইন পাবলিশিং ওয়েবসাইটটির অনবদ্য প্রচেষ্টা স্বরূপ বিভিন্ন ধরনের বাংলা সাহিত্যের উন্মোচনের মাধ্যমে বাংলা জগতের গর্বিত বাঙালীর সন্নিকটে নবাগত তরুণ প্রজন্মের সাহিত্যিকগণের আত্মপ্রকাশ করার নিতান্তই একটি প্রয়াসমাত্র ।

Powered By Blogger

Wikipedia

Search results

Pageviews

নিচের FOLLOW BUTTON টির দ্বারা আপনি ওয়েবসাইটটি FOLLOW করতে পারেন।

Sunday, 19 July 2026

'ডাক্তারবাবুর ডায়েরি'/ 'বাংলা গল্পসল্প' নিবেদিত একখানা ছোট্ট রোমাঞ্চকর গল্প ।

ডাক্তারবাবুর ডায়েরি

বর্ধমান শহরের পাঁকা রাস্তা আর পুরোনো অলিগলির মোড়ে মোড়ে যে কটা আড্ডার জনপ্রিয় ঠেক আছে, তার মধ্যে আমাদের বাবুরবাগের শিব সংকর সেবা সদন রোডের মোড় মাথায় সোনা দা’র চায়ের দোকানটা হল এককথায় প্রাণকেন্দ্র।  সোনা দা কাঁচের বয়ামগুলো সারি দিয়ে সাজিয়ে, মাটির জ্বাল ধরিয়ে যখন ভাঁড়ে কড়া করে লিকারের চা ঢালত—তার স্বাদই ছিল আলাদা! চা তো নয়, ও যেন ছিল আমাদের মতো আড্ডাবাজ বেকার আর শিক্ষিত ছেলেগুলোর জন্য অমৃত।

আর এই অমৃত চায়ের আড্ডায় প্রায় প্রতিটি বিকেলে আমাদের মূল আকর্ষণ ছিলেন ডাক্তারবাবু। ওনার পুরো নামটা পাড়ার কজন জানত সন্দেহ, সবাই একডাকে ‘ডাক্তারবাবু’ বলেই চিনত।  অমায়িক তাঁর ব্যবহার, ঠোঁটের কোণে সবসময় লেগে থাকা একফালি মিষ্টি ও রহস্যময় হাসি—সব মিলিয়ে পুরো বাবুরবাগের মানুষ তাঁকে অগাধ শ্রদ্ধা করত।  ডাক্তারবাবুর পাশে বসা মানেই শুধুই গল্প নয়, বিজ্ঞান, মহাবিশ্ব কিংবা দর্শনের নতুন কোনো দিগন্তের সন্ধান পাওয়া।  আমরা হা করে ওনার কথা শুনতাম।

কিন্তু সেই ডাক্তারবাবুকেই বেশ কয়েকদিন থেকে আর সেই আগেকার চেনা  মানুষটা মনে হচ্ছিল না।  সেই চেনা, হাস্যোজ্জ্বল ডাক্তারবাবু যে একদিন এমন এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাবেন, তা আমাদের কল্পনাতেও আসেনি।

প্রথম পরিবর্তনটা ধরা পড়েছিল খুব সূক্ষ্মভাবে।  তাঁর পোশাক-আশাক কেমন যেন অবিন্যস্ত হতে লাগল, আর চোখেমুখে ফুটে উঠতে লাগল কোনো এক গভীর উৎকণ্ঠা।  তাঁর আচরণগুলো তখন ছিল অনেকটা সায়েন্স-ফিকশন মুভির সেই ক্ষ্যাপা বিজ্ঞানীদের মতো!

আমরা তখনো বিষয়টাকে গম্ভীরভাবে নিইনি।  চায়ের দোকানে বসে হাসাহাসিও কম হয়নি।

একদিন বিকেলের ঘটনা।  সোনা দা গরম গরম চায়ের ভাঁড়টা ডাক্তারবাবুর সামনের কাঠের টেবিলে রাখতে না রাখতেই, ডাক্তারবাবু একদম গম্ভীর মুখে নিজের স্টেথোস্কোপটা পকেট থেকে বের করে চায়ের কাপের গায়ে চেপে ধরলেন।  আড্ডার সবাই একমুহূর্তে চুপ।  হঠাৎ ডাক্তারবাবু এক বিকট চিৎকার করে উঠলেন, "এতে তো হৃদস্পন্দন নেই! তার মানে চা-টা মৃত!"

সোনা দা তো ভ্যাবাচেকা খেয়ে থ।  সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, "ডাক্তারবাবু, ওটা তো চা, মানুষ নয় যে ওর বুক ঢিপঢিপ করবে!" ডাক্তারবাবু তখন চোখের চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে চোখ পাকিয়ে বললেন, "তুমি অশিক্ষিত, কিচ্ছু বুঝবে না! তারপর আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, "এই লিকারে অশুভ শক্তির নাড়ির স্পন্দন লুকিয়ে আছে।  প্রতিদিন তোমরা বিষ পান করছ!"

আমরা তখন বেঞ্চের পেছনে মুখ লুকিয়ে হাসছি।  কিন্তু পাগলামিটা শুধুই চায়ের দোকানে সীমাবদ্ধ থাকল না।  ওনার চেম্বারেও ছড়িয়ে পড়ল।  রোগীরা যখন ওনার কাছে যাওয়া শুরু করল, তিনি আর ওষুধের নাম লিখতেন না।  প্রেসক্রিপশনের সাদা কাগজে আঁকতে শুরু করলেন অদ্ভুত সব জ্যামিতিক নকশা—কোনোটা সুক্ষ্ম ত্রিভুজ, কোনোটা সমান্তরাল বৃত্ত, তো কোনোটা অসম্পূর্ণ ট্রাপিজিয়াম।

একবার পশ্চিমপাড়ার এক বয়স্ক রোগী শান্তিলাল মুর্মু পেটের ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসে কাঁদ কাঁদ হয়ে আমাদের বলল, "ডাক্তারবাবু এ কী লিখেছেন? ওষুধের দোকানে গিয়ে দেখালাম, ওরা তো হেসে উ.. উড়িয়ে দিল! বলল এটা তো ওষুধ নয়, এটা একটা ত্রিভুজ!"

শান্তিলালকে চেম্বারে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করাতেই ডাক্তারবাবু গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন, "ওটা ওষুধ নয়, ওটা হলো তোমার পেটের ভেতরের অশুভ শক্তিকে তাড়িয়ে দেওয়ার জ্যামিতিক নকশা।  প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এই কাগজের দিকে দশ মিনিট একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকবে, ব্যাধি একদম গায়েব হয়ে যাবে!" বেচারা রোগী তো ওষুধের দোকানদারের কাছে লাঞ্ছিত হয়ে অবশেষে অন্য ডাক্তারের কাছে ছুটল।

তার থেকেও রহস্যময় হয়ে উঠল ডাক্তারবাবুর হাতের সেই জীর্ণ, চামড়ায় বাঁধানো পুরোনো ডায়েরিটা। কোত্থেকে এল এই ডায়েরি, কেউ বলতে পারে না।  পরে জানতে পারলাম—ডাক্তারবাবু এই ডায়েরিটা পেয়েছিলেন এক রহস্যময় আগন্তুকের কাছ থেকে।  কিন্তু কে সেই ব্যক্তি? কেউ জানে না।  রোগী দেখার ফাঁকে তিনি একদৃষ্টে ডায়েরির পাতায় ঝুঁকে থাকতেন, কখনও রক্তবর্ণ চোখে টানাহাতের ইংরেজিতে কি সব হিজিবিজি লিখতেন।

এক বিকেলে দেখলাম, ডাক্তারবাবু চেম্বারে একা বসে শূন্যে হাত মেলাচ্ছেন আর বাতাসকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, "হ্যাঁ, হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি! বর্ধমানের তাপমাত্রা বড্ড বেশি, তাই না? অশুভ শক্তিরাও গরমে অস্থির, তাই তো?"

বাইরের লোকজন ভেবেছিল কোনো হাই-প্রোফাইল নেতা বোধহয় আসতে চলেছে, তাই ডাক্তারবাবু প্র্যাকটিস করছেন! কিন্তু আমাদের কাছে পুরো বিষয়টা দিন দিন গা-ছমছমে হয়ে উঠছিল।

একদিন আমরা চেম্বারে গিয়ে দেখি তিনি ল্যাম্পের আলোয় চশমাটা সাদা রুমাল দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিষ্কার করছেন।  তিনি বিশ্বাস করতেন, চশমার কাঁচের ওপর দিয়েই ডায়েরির সব গোপন রহস্য পৃথিবীতে প্রতিফলিত হয়।  আমজাদ পেছনে দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করে বলে উঠল, "ডাক্তারবাবু, চশমাটা না পরিষ্কার করে একটু সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেললে হতো না?" ডাক্তারবাবু এমন এক হিমশীতল ও হিংস্র দৃষ্টিতে ঘুরলেন যে আমজাদ ভয়ে তৎক্ষণাৎ চেম্বারের বাইরে গিয়ে চম্পট দিল!

ডাক্তারবাবুর সবচেয়ে হাসির এবং ভয়ের দৃশ্য ছিল যখন তিনি নিজের ছায়ার সাথে তর্ক করতে লাগলেন।  ডাক্তারবাবু যে আসলেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন, নাকি কোনো এক বড় রহস্যের জালে আটকা পড়েছিলেন, সেটা বোঝা আমাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। 

তারপর হঠাৎ একদিন ডাক্তারবাবুর আচরণে চরম অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিল।

সেদিন বিকেলে চায়ের দোকানে আমরা আড্ডা দিচ্ছি।  ডাক্তারবাবু হন্তদন্ত হয়ে এলেন।  গায়ে তাঁর ছেঁড়া জামা, চোখে চরম আতঙ্ক।  তিনি সোজা আমার দিকে এগিয়ে এলেন এবং হাত বাড়িয়ে সেই পুরোনো ডায়েরিটা আমার দিকে সজোরে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, "বাবু, এই ডায়েরিটা তুই রাখ্।  তোর অনেক কাজে লাগবে, তোর অনেক উন্নতি হবে।  এটার মধ্যে এমন সব মহাজাগতিক আইডিয়া আছে যা তুই কল্পনাও করতে পারবি না।  এটাকে প্রাণের মতো আগলে রাখিস্!"

কথাটা বলেই তিনি হঠাৎ খিক্ খিক্ করে এক শয়তানি হাসি হাসলেন।  তারপর আবার নিস্তব্ধ হয়ে মাথাটা ঝুঁকিয়ে অনেকটা সময় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।  হঠাৎ তাঁর চোখের চশমাটা মাটিতে খসে পড়ল।  কিন্তু তিনি চশমাটা তুললেন না।  চশমাটা মাটিতে রেখেই হন্ হন্ করে চেম্বারের দিকে হেঁটে চলে গেলেন।

আমি চশমাটা মাটি থেকে তুলে ডাক্তারবাবুর পেছন পেছন ছুটলাম।  কিন্তু মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান! চেম্বারে গিয়ে দেখি—ঘর একেবারে ফাঁকা! ডাক্তারবাবু নেই, কোনো রোগী নেই, এমনকি আলোটাও জ্বলছে না।  একজন রক্তমাংসের মানুষ কীভাবে চোখের সামনে হাওয়া হয়ে যেতে পারে, ভেবে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল।

সেই রাতেই খবর পাওয়া গেল, ডাক্তারবাবু নিরুদ্দেশ।  তাঁর পরিবার-পরিজন কেউ বর্ধমানে থাকত না, সবাই বাইরে।  পুলিশ এসে গতানুগতিক ছানবিন করে চলে গেল।  বর্ধমানের বুক থেকে তিনি যেন চিরকালের মতো মিলিয়ে গেলেন। 

ডায়েরিটা পাওয়ার পর আমার তো রাতের ঘুম উড়ে যাওয়ার যোগাড়! ডায়েরির মধ্যে কোনো সূত্র পায় কিনা জানার জন্য ডায়েরিটা খুলে পাতা উল্টে পাল্টে পড়তে লাগলাম।  কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারলাম না। ডায়েরির প্রত্যেকটি ডান পৃষ্ঠায় কিসব অদ্ভুত নক্শা আঁকা আছে।  আর প্রায় প্রতিটি বাম পৃষ্ঠায় ডাক্তারবাবুর টানাহাতের ইংরেজিতে লেখা অজস্র পঙতি।  সেগুলোর দুটোয় মাথায় ঢুকলো না।  পুলিশের হাতে ডায়েরিটা তুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা ডায়েরির প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখাল না।  ওটা আমাকে যত্ন করে রেখে দিতে বলল।  পরে নাকি কাজে লাগতে পারে। 

আমি পড়াশোনা খুব একটা করি না, একধরণের আড্ডাবাজ ছেলে আরকি! তাই ভাবলাম ডায়েরিটা আমার কোনো কাজের নয়।  আমার বন্ধু আমজাদ ছোটবেলা থেকেই মেধাবী, ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে, বিজ্ঞানের বড় বড় বই পড়ে।  ভাবলাম ডায়েরিটা ওর হাতে তুলে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

একদিন আমজাদকে ডেকে ডায়েরিটা দিয়ে বললাম, "দ্যাখ্ আমজাদ, তুই তো জানিস্ এটা আমাদের ডাক্তারবাবুর স্মৃতি। তুই ডাক্তার হতে চাস, বিজ্ঞানের বই পড়িস—এটা তোর কাছেই থাক।  আমার মাথায় এসব ঢুকবে না। "

আমজাদ খুব উৎসাহ নিয়ে ডায়েরিটা নিজের বুকে জড়িয়ে ধরেছিল।  কিন্তু আমরা জানতাম না, আমরা অজান্তেই নিজেদের জীবন ধ্বংস করার এক ভয়ানক ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছি।

ডায়েরিটা পাওয়ার দিন-চারেক পার হতে না হতেই আমজাদের রূপ সম্পূর্ণ বদলে গেল।  সে আর বাইরে বের হতো না, নিজেকে ঘরের ভেতর বন্দি করে ফেলল।  রাস্তাঘাটে দেখা হলে আগে যেমন জড়িয়ে ধরে হাসত, এখন আর আমাদের দিকে তাকাতই না।  মনে হতো যেন অন্য কোনো অচেনা জগতের ভাবনায় সে ডুবে আছে।

আমজাদের বাড়ি গিয়েও দেখা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল।  দিনরাত ঘরের দরজা বন্ধ।  জানালার একটা পাল্লা একটু ভাঙা আর আমি সেই ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখতাম—ওর ঘরটা যেন একটা আস্ত রহস্যময় ল্যাবরেটরি হয়ে উঠেছে! ঘরের মেঝেতে এবং চুনকাম করা দেওয়ালে ডায়েরির মতো অদ্ভুত সব জ্যামিতিক নকশা সে কয়লা আর চক দিয়ে এঁকে চলেছে।  

আমি যখনই দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ি, আমজাদ চিৎকার করে বলে, "বাবু দা, তুমি চলে যাও! ওরা আমাকে দেখে ফেলবে! ডাক্তারবাবু যেটা শুরু করেছিলেন, আমাকে সেটা শেষ করতেই হবে। "

একদিন আমি আর থাকতে না পেরে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ওর ঘরে ঢুকলাম।  দেখলাম আমজাদ ঘরের এক কোণায় বসে ঘরের সুইচটা দ্রুত অন-অফ করছে।  বাতিটা জ্বলছে আর নিভছে।  আর আমজাদ ফিসফিস করে বলছে, "ইলেক্ট্রনগুলো খুব অস্থির, বাবু দা! ওরা চাইছে না আমি সূত্রটা বের করি।  ওরা ডায়েরির পাতায় কথা বলে, জানো!"

আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, "আমজাদ, তুই এসব কী করছিস? ছাড় এসব পাগলামি, চল্ সোনা দা’র দোকানে কড়া করে চা খেয়ে আসি। "

আমজাদ তখন আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন আমি কোনো ভিনগ্রহের জীব! সে এক বিকৃত হাসি হেসে ফিসফিস করে বলল, "চা? চা দিয়ে কি আত্মার ওজন মাপা যায়? ডাক্তারবাবু ঠিকই বলেছিলেন—চা আড্ডার জন্য ভালো, কিন্তু পরম সত্য অনুসন্ধানের জন্য নয়!"

এরপরই সে হঠাৎ অকারণে হাসতে হাসতে ঘরের ফাঁকা দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে স্যালুট দিল! দেওয়ালে কেউ নেই, কিন্তু আমজাদের হাবভাব দেখে মনে হলো সে যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি বা সেনাপতির আদেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।

তার কথাবার্তাও অদ্ভুত হয়ে উঠেছিল।  মাঝে মাঝেই এমন সব শব্দ ব্যবহার করত যা কোনো অভিধানে পাওয়া যাবে না।  কোনো দিন জানলার পর্দা টেনে রাস্তায় বৃষ্টি পড়া দেখে বলত, "আজ আকাশটা ডায়েরির পাতার মতো নীল হয়ে আছে, দেখছ না?"

সবচেয়ে অদ্ভুত লাগত তার মনের ওঠানামা।  একটু আগে বিজ্ঞানের জটিল বিষয় নিয়ে চ্যাঁচামেচি করছে, তো পর মুহূর্তেই পাথরের মতো চুপ।  জানলার ফাঁক দিয়ে রাস্তার দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকত।  কেউ যদি জিজ্ঞেস করত, কী করছিস্? সে খুব শান্ত গলায় উত্তর দিত, "দেখছি ডাক্তারবাবু ফিরে আসছেন কি না।  তিনি যখন ফিরবেন, তখন এই পুরো বর্ধমান শহরটা ডায়েরির অক্ষরের মতো কেঁপে উঠবে। "

এক বিকেলবেলা আমজাদের ঘরের ভেতর থেকে অদ্ভুত এক সুর ভেসে আসছিল।  আমি জানলা দিয়ে উঁকি মারতেই দেখলাম আমজাদ ঘরের মাঝখানে একটা চেয়ারে উল্টো হয়ে বসে আছে, আর তার সামনে রাখা পুরোনো একখানা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার—সেটাকেই সে ডায়েরির মন্ত্র পড়ে প্রাণ দেওয়ার চেষ্টা করছে! সে গম্ভীর মুখে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারকে বলছে, "শোন, তুই ডাক্তারবাবুর চেম্বারে গিয়ে সব ফাইল ক্লিন করবি, কিন্তু আলমারিটা যেন একদম নড়াস না, ওটা অশুভ!"

আরেকবার, আমজাদ হঠাৎ মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে ট্রাফিক পুলিশের মতো হাত নাড়তে শুরু করল।  আমি দৌড়ে গিয়ে বললাম, "কী করছিস আমজাদ? গাড়ি চাপা পড়বি তো!" আমজাদ চোখ পাকিয়ে বলল, "আরে, এগুলো তো গাড়ি নয়, এগুলো সব অদৃশ্য ভূত! আমি এদের সিগন্যাল দিচ্ছি যাতে ওরা ডাক্তারবাবুর চেম্বারের দিকে না যায়। "

সবচেয়ে রহস্যময় ব্যাপার হলো, আমজাদের আলমারিতে এখন বইয়ের বদলে ভর্তি নানা রঙের লতাপাতা আর অদ্ভুত সব পাথর।  সে দাবি করত, এই পাথরগুলো ডাক্তারবাবুর ডায়েরির মন্ত্র দিয়ে চার্জ করা।  একদিন আমজাদ আমাকে একটা নীল রঙের পাথর ধরিয়ে দিয়ে বলল, "এটা ধরো, এটা তোমাকে বলে দেবে তোমার মনের কথা। " 

আমি পাথরটা ধরতেই সেটা হাত থেকে মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল, আর বিস্ময়করভাবে ভেতর থেকে সোনা দা’র দোকানের স্পেশাল মশলা চায়ের সুগন্ধ বের হতে লাগল! আমরা দুজন চুপচাপ পাথরটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।  ডায়েরির রহস্য কি তবে চায়ের দোকানের আড্ডার সঙ্গেই কোনোভাবে যুক্ত?

আমজাদ মাঝে মাঝে রাতের অন্ধকারে ছাদে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করত, "ডাক্তারবাবু, আপনার চশমাটা কি ওখানে? মেঘের আড়ালে লুকাবেন না, প্লিজ!" পাড়ার লোকে ভাবত আমজাদ প্রেমে পড়েছে, আর আমি জানতাম—সে এক ভয়াবহ অভিশপ্ত মায়াজালে তলিয়ে যাচ্ছে। 

একদিন গভীর রাতে, যখন বাবুরবাগ তথা বর্ধমান শহরটা পুরো নিঝুম, আমি চুপচাপ আমজাদের ঘরের জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।  ভেতরে সাধারণ আলো জ্বলছিল না—এক অদ্ভুত নীলচে আভা ঘরের ভেতর থেকে ছড়াচ্ছিল।

উঁকি মেরেই আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল! আমজাদ ডায়েরির ওপর হাত রেখে বিড়বিড় করছে।  আর ডায়েরির পাতা থেকে হালকা নীল ধোঁয়া বেরিয়ে ঘরের সিলিংয়ের কাছে গিয়ে জমা হচ্ছে।  সেই ধোঁয়া ধীরে ধীরে এক আবছায়া মূর্তির রূপ নিচ্ছে—যার অবয়ব অবিকল ডাক্তারবাবুর মতো, কিন্তু মুখটা ভীষণ নিষ্ঠুর!

আমজাদ নিজের মনেই বলে যাচ্ছে, "আমি বুঝতে পেরেছি... মানুষ হওয়াটা একটা ভুল ছিল।  এই জ্ঞানের শেষ নেই..."

হঠাৎ সেই নীল আলো নিভে পুরো ঘর কুচকুচে অন্ধকার হয়ে গেল।  আর সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে এক ভিনগ্রহের মতো কর্কশ কণ্ঠ ভেসে এল—যা কোনো মানুষের হতে পারে না। শব্দটা সরাসরি আমার মগজে এসে ধাক্কা দিল—"তুমি যা খুঁজছো, তা তোমার ধ্বংসের কারণ হবে।  এই ডায়েরিটা তোমার বংশের অভিশাপ!"

আমি ভয়ে ছিটকে পিছিয়ে এলাম।  আরও ভয়ংকর ব্যাপার হলো, আমি যখন ভয়ে দৌড়ে গলির মোড়ে এলাম, দেখলাম রাস্তার ওপারে একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট পরে ডাক্তারবাবু দাঁড়িয়ে আছেন! তিনি আমার দিকে তাকিয়ে এক শয়তানি হাসি হাসলেন, আর তারপর গলির মোড়ের এক কাল্পনিক দরজার ভেতর দিয়ে বাতাসে অদৃশ্য হয়ে গেলেন!

আমি বুঝতে পারতাম না, ওটা আমজাদ ছিল, নাকি ওই ডায়েরিটার কোনো এক অভিশপ্ত ছায়া তার গলার স্বরে কথা বলছিল।  আমজাদের চোখ দুটো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে থাকত, যেন সে আমাদের এই জগতকে দেখছে না, দেখছে অন্য কিছু—যা আমাদের চোখের আড়ালে।

ডাক্তারবাবু মাঝে মাঝে ঐ ডায়েরিতেই লিখেছেন, "আজ সেই লোকটি আবার এসেছিল।  তার চোখের চাহনি মোটেই মানুষের মতো নয়।  সে আমার হাতে এই ডায়েরিটা তুলে দিয়ে গেল, আর বলল—এর ভেতরে যা লেখা আছে, তা মানব সভ্যতার জানা জগতের বাইরের এক সত্য। "

তবে এই ডায়েরিটা কি কোনো অভিশাপ বহন করছে? নাকি এর পাতায় পাতায় এমন কোনো জ্ঞান আছে যা সাধারণ মানুষের সহ্য ক্ষমতার বাইরে? আমি আরও ভয় পেয়ে গেলাম।  ডাক্তারবাবু কি সেই অজানা ব্যক্তির কোনো গোপন মিশনে নামিয়ে দিয়ে গেছেন আমাদের? আমজাদ কি এখন আর আমাদের সেই বন্ধু নেই, নাকি অন্য কোনো সত্তা তার ভেতরে বাসা বেঁধেছে? বর্ধমানের এই অন্ধকার রাতে, ডাক্তারবাবুর সেই ডায়েরিটা এখন আমজাদের বালিশের নিচে রাখা।  আর আমি ভাবছি—পরের শিকার কি আমি? কারণ ডায়েরিটা তো প্রথমে আমারই হাতে এসেছিল।  

আমি বুঝতে পারলাম, আমজাদকে বাঁচাতে হলে আমাকে সেই 'অজানা ব্যক্তি'র সন্ধানে নামতে হবে, যে এই ডায়েরির মধ্যে দিয়ে ভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে।  ইচ্ছাকৃতভাবে না করলেও আমজাদের এই অবস্থার জন্য আমিই দায়ী।  কিন্তু আমি কি আদৌ সেই শক্তিকে আটকাতে পারব? নাকি আমিও এই ডায়েরির পরের পাতায় নাম লেখা হয়ে গেছি

আমজাদকে এই চরম উন্মাদনা থেকে বাঁচাতে আমি মরিয়া হয়ে উঠলাম।  এখন আমার সামনে একটাই রাস্তা—সেটাকে ধ্বংস করা।  কিন্তু কীভাবে? তবে যেভাবেই হোক করতেই হবে।  যে করেই হোক এই অশুভ শক্তির সাথে লড়াই করতে হবে আর জিততেও হবে, না হলে আমজাদকে বাঁচানো যাবে না।  আর ও যদি ডাক্তারবাবুর মতো হারিয়ে যায় তাহলে নিজের কাছেই আমি হেরে যাবো।  নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না।

আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, ডাক্তারবাবু আসলে পাগল হয়ে যাননি।  তিনি এই ডায়েরির প্রভাবে এক অপচ্ছায়া শক্তির কবলে পড়েছিলেন।  আমজাদকে ডায়েরি দেওয়ার আগে আমি শেষ পাতাটা উল্টেছিলাম। সেখানে পাড়ার পশ্চিম দিকের সেই পুরোনো পরিতক্ত 'বাংলোটার হুবহু মতো একটা স্কেচ আঁকা ছিল।  আর নিচে লেখা ছিল—

"যেখানে ছায়া কথা বলে।  যে আলো দিয়ে সে আসে, সেই আলোতেই সে ধ্বংস হয়। "

ডাক্তারবাবু যাওয়ার আগে চশমাটা মাটিতে ফেলে রেখে গিয়েছিলেন আর বলেছিলেন, "ডায়েরিটা তোর উন্নতি করবে। " আজ আমার মাথায় বিদ্যুতের মতো চমকে উঠল—'উন্নতি' মানে বিদ্যা বা টাকা নয়, এই অশুভ শক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একে ধ্বংস করার আত্মিক শক্তি! আর ডাক্তারবাবুর সেই চশমাটাই হলো এই শক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা! 

আমজাদের অবস্থা দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছিল।  এদিকে ওর বাবা-মা ভাবছিলেন ছেলে পড়াশোনা ছেড়ে বখে গেছে, দিনরাত ঘরের দরজা বন্ধ করে কী সব বদমাহেশি আর খামখেয়ালিপনা করছে! ওনাদের বকাঝকা আর কান্নাকাটি পাড়ার লোক হাসাহাসি করলেও, আমি জানতাম সত্যটা কতখানি ভয়ঙ্কর।  বিষয়টা নিয়ে কারো সাথে চর্চা করার সাহস হলনা, লোকে শুনলে হাসিঠাট্টা করবে।  কিন্তু কি করবো কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না।  অনেক চেষ্টা করে শেষমেষ সাহস জোগালাম সেই অশুভ শক্তির সাথে লড়াই করার।

তারপর সুযোগটা এলো এক অন্ধকার অমাবস্যার রাতে।  আমজাদের বাবা-মা জরুরি কাজে আত্মীয়ের বাড়ি গিয়েছিলেন।

মাঝরাতে জানলা দিয়ে দেখলাম এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য, সে একটা ঘোরের মধ্যে ঘরের ঠিক মাঝখানে কাঠপুতুলের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে।  ডাকলেও কোনো সাড়াশব্দ নাই। 

তারপর হঠাৎ দরজা খুলে সে বেরিয়ে এল রাস্তায়।  হাতে সেই ডায়েরি, সোজা হেঁটে চলেছে পাড়ার উপকণ্ঠে থাকা সেই পরিত্যক্ত ভুতুড়ে বাংলোর দিকে।  নিশ্চয় ডায়েরির ভেতরের অশুভ শক্তিটাই তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল নিজের মূল ঘাঁটিতে।  আমি আর দেরি না করে পকেটে ডাক্তারবাবুর ফেলে যাওয়া চশমাটা, একটা ছোট আয়না আর এক বাক্স দেশলাই নিয়ে আমজাদের পিছু নিলাম।

ধ্বংসাবশেষ ভুতুড়ে বাংলোর মধ্যে যখন ঢুকলাম, দেখলাম আমজাদ ঘরের মাঝখানে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছে।  আর তার সামনে ঘরের বাতাস ঘন হয়ে ফুটে উঠেছে সেই নীলচে মূর্তির রূপ!

সেই অশুভ সত্তার সামনে দাঁড়িয়ে আমি একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়লাম।  পুরো শরীরটা আপনাআপনিই কেঁপে উঠল।  পা দুটো একদম অবশ হতে লাগল।  সেই মূর্তি এতক্ষণ আমার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর সে যখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল, আমার রক্ত হিম হয়ে গেল।  তার কোনো চোখ ছিল না, চোখের কোটরে শুধু ধোঁয়া পাক খাচ্ছিল।  কণ্ঠস্বর যেন শত শত মৃত মানুষের আর্তনাদ—

"ডাক্তারবাবু তো শুধু এক পথপ্রদর্শক ছিলেন  সে এই পরম জ্ঞান সহ্য করতে না পেরে ধ্বংস হয়ে গেছে।  এই ডায়েরি হলো নরকের চাবিকাঠি।  যারা এই ডায়েরি পড়বে, তাদের সত্তা ধীরে ধীরে আমার জগতে মিশে যাবে। "

আমি ভয়ে জমে গিয়েছিলাম।  সে আরও বলল, "তুমি জানো না, এই বর্ধমান শহরের মাটির নিচে কত কত ডায়েরি বছরের পর বছর ধরে চাপা পড়ে আছে।  ডাক্তারবাবু ছিলেন আমার প্রথম সংগ্রহ।  তুমিই ছিলে দ্বিতীয়, লেখাপড়াটা তো ঠিকমতো করলে না, নইলে আজ অন্য জায়গায় পৌঁছে যেতে।  অথচ তুমিই আমজাদকে বানালে দ্বিতীয়।  কিন্তু তুমি হলে সেই শিকার, যে নিজের ইচ্ছায় আমার দরজায় এসে ধাক্কা দিয়েছ। "

এই বলে সে তার খসখসে হাতটা আমার দিকে বাড়াতেই ঘরের বাতাস ভারি হয়ে এলো, আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল।  কিন্তু এবার আর আমি পিছালাম না।

আমি চিৎকার করে উঠলাম, "তুই যার আত্মা চুষে নিয়েছিস, তাঁর শেষ দৃষ্টি এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি রে! তাঁর চশমাতেই রয়ে গেছে তাঁর দেখার শেষ তেজ!"

আমি এক ঝটকায় আমজাদের হাত থেকে ডায়েরিটা কেড়ে নিলাম।  শেষ পাতাটা ছিঁড়ে দেশলাই দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিলাম! আর অন্য হাতে ডাক্তারবাবুর চশমাটা আয়নার ওপর চেপে ধরে জ্বলন্ত পাতার আলো সরাসরি ফেললাম সেই অভিশপ্ত মূর্তির বুকে!

জ্বলন্ত ডায়েরির পাতার অগ্নিশিখা যখন চশমার কাঁচ ও আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে সেই মূর্তিকে স্পর্শ করল, পুরো নীলকুঠি কেঁপে উঠল এক প্রলয়ঙ্ককারী চিৎকারে! দেওয়ালে থাকা জ্যামিতিক নকশাগুলো উজ্জ্বল হয়ে যেন ডাক্তারবাবুর দেওয়া সেই প্রেসক্রিপশনের মতো অশুভ শক্তিকে বন্দি করার খাঁচা হয়ে গেল!

সত্তাটি কাগজের মতো পুড়তে পুড়তে গর্জে উঠল, "তুই আমাকে সরাতে পারবি, কিন্তু এই শহরের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা সত্যকে মুছবি কী করে?"

আমি শেষবারের মতো চিৎকার করে বললাম, "যতদিন বর্ধমানের মোড়ে মোড়ে সত্যি আর ভালো মানুষের চায়ের আড্ডায় ভালোবাসা থাকবে, ততদিন তোর এই কাগজের তৈরি মিথ্যে সাম্রাজ্য আমাদের ছুঁতেও পারবে না!"

তক্ষুনি একটি প্রবল বিস্ফোরণের শব্দ হলো।  নীল আলো তীব্র সাদা বর্ণ ধারণ করে ঘরটাকে ঝলসে দিল। আর সেই সত্তাটি এবং তার অশুভ ডায়েরিটি আগুনের মতো জ্বলে ছাই হয়ে বাতাসের সাথে মিশে গেল। আমজাদ এক ঝটকায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে আমজাদ যখন নিজের ঘরে জেগে উঠল, ও ভাবল রাতে বিছানাতেই ঘুমোচ্ছিল।  ওর মন থেকে সমস্ত কুচ্ছিত ঘোর আর পাগলামি কেটে গেছে।  ওর বাবা-মা ভাবলেন ছেলের হয়তো মাথার ওপর কোনো ভৌতিক দৃষ্টি ছিল, তা কেটে গেছে।  ওরা কেউই জানল না, বর্ধমানের এই বুক থেকে সেই রাতে কী ভয়ঙ্কর একটা অন্ধকার নিঃশব্দে মুছে গেছে।  সেই রহস্য চিরকালের মতো শুধু আমাদের দুজনের মধ্যেই রয়ে গেল।

আমজাদ এখন আবার আগের মতো পড়াশোনায় মনোযোগী, ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

প্রতিদিন রাতে যখন বর্ধমানের আকাশে চাঁদ ওঠে, আমি সেই পুরনো বাংলোটার দিকে নজর রাখি।  যখন ছায়ামূর্তির মতো কাউকে দেখতে পায়, অমনি দৌড়ে যাই।  কিন্তু প্রতিবারই দেখি, ভুল দেখছি।  ডাক্তারবাবুর সেই প্রিয় সাদা অ্যাপ্রনটা কি আজও কোথাও ঝুলে আছে? তিনি কি আমাদের ডাকছেন, নাকি তিনি সেই ডায়েরির পাতায় পাতায় যে গোলকধাঁধায় মেতে থাকতেন, তাতে নিজেই হারিয়ে গেছেন?

সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো, ডাক্তারবাবুর চেম্বারে এখনো সব জিনিসপত্র ঠিকঠাক সাজানো। টেবিলের ওপর সেই পুরনো প্রেসক্রিপশনের প্যাড, স্ট্যাম্প সব এখনো পড়ে আছে।  দেখে মনে হয়, তিনি এখনই হয়তো চেম্বারে ফিরে এসে আবার রোগীদের ডাকবেন।

আমাদের ভয়টা কেবল এটাই—ডাক্তারবাবু একা নেই তো? তিনি যেখানেই থাকুন, তিনি কি আদৌ আমাদের চেনা সেই মানুষটি হিসেবে আছেন? নাকি অশুভ শক্তি তাকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে যে, তিনি ফিরে এলেও আমরা আর তাঁকে চিনতে পারব না? এই অনিশ্চয়তাই আমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। 

ডাক্তারবাবুকে নিয়ে এই অনিশ্চয়তা আমাদের আড্ডার প্রতিটি মুহূর্তকে যেন ভারি করে তুলেছে।  চায়ের দোকানে আগের সেই হাসি-ঠাট্টা আর আড্ডাটা এখন আর নেই।  সবাই এখন চায়ে চুমুক দিয়ে এদিক-ওদিক তাকায়, যেন হঠাৎ ডাক্তারবাবু সেই চিরচেনা ভঙ্গিতে এসে হাজির হবেন।

ডাক্তারবাবুর নিরুদ্দেশ হওয়াটা যেন পুরো পাড়ার জন্য একটা অমীমাংসিত ধাঁধা। পুলিশ মাঝে মধ্যে এসে খোঁজখবর নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বর্ধমানের এই অলিগলি থেকে দিব্যি একজন মানুষের এভাবে হাওয়া হয়ে যাওয়াটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।  কেবল মাঝে মাঝে বাতাসের ঝাপটায় যখন আমাদের কানে আসে অস্পষ্ট ফিসফিসানি, আমরা শুধু একে অপরের দিকে তাকাই।  আমরা বেঁচে গেছি ঠিকই, কিন্তু বর্ধমানের এই কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে আজও কি কোথাও কোনো ডায়েরি তার শিকারের অপেক্ষায় পড়ে আছে? সেই রহস্য রয়ে গেল লোকচক্ষুর অন্তরালে।   

                                                                                                

সমাপ্ত

 

                                                                                       লেখক – আলীম বাবু

 


No comments:

Post a Comment