বাংলা গল্পসল্প

"BanglaGolpoSolpo" is all about Bengali stories, Bengali Poems, Articles etc. 'বাংলা গল্পসল্প'র তরফ থেকে সকল পাঠকগণ, শ্রোতাগণ ও লেখকবন্ধুদের জানাই হার্দিক অভিনন্দন, ভালোবাসা, প্রীতি ও শুভেচ্ছা এবং শুভকামনা। এই অনলাইন পাবলিশিং ওয়েবসাইটটির অনবদ্য প্রচেষ্টা স্বরূপ বিভিন্ন ধরনের বাংলা সাহিত্যের উন্মোচনের মাধ্যমে বাংলা জগতের গর্বিত বাঙালীর সন্নিকটে নবাগত তরুণ প্রজন্মের সাহিত্যিকগণের আত্মপ্রকাশ করার নিতান্তই একটি প্রয়াসমাত্র ।

Wikipedia

Search results

Pageviews

নিচের follow button টির দ্বারা আপনি এই ওয়েবসাইট টি follow করতে পারেন ।

Thursday, 30 July 2026

পুকুর চুরি / 'বাংলা গল্পসল্প' নিবেদিত একখানা ছোট্ট রোমাঞ্চকর গল্প ।


পুকুর চুরি

গ্রামের নাম 'রামপুর'। এই রামপুরের মাঠের মাঝখানে একটা বিশাল সাইজের সম্পত্তি হলো রায় পরিবারের পৈতৃক পুকুরটা—স্থানীয়রা যাকে একডাকে চেনে 'বড় পুকুর' বলে। পুকুরটার জল টলটলে, ঘাটে বাঁধাই ঘাট আর চারপাশে ছায়াঘেরা নারকেল গাছের সারি। কিন্তু সমস্যা হলো, এই পুকুরটার ওপর নজর পড়েছে এলাকার উদীয়মান এবং অতিউৎসাহী নেতা—নেপাল বাবুর। 

নির্বাচন সামনে, তাই নেপাল বাবু ঠিক করেছেন এলাকার সাধারণ মানুষের মন জয় করতে একটা দারুণ কিছু করতে হবে। তাঁর মাথায় বুদ্ধি এল, রায় পরিবারের এই ব্যক্তিগত পুকুরটাকেই হঠাৎ করে "সার্বজনীন সম্পত্তি" ঘোষণা করে দেওয়া যাক! গরিব দুঃখী মানুষ এসে এখানে স্নান করবে, মাছ ধরবে—এতে ভোটের বাক্স একেবারে ভারী হয়ে যাবে। আর রায় পরিবার? কে শোনে তাদের কথা! জমিদারদের দিন তো কবেই শেষ। 

উদ্বোধনের দিন ঘিরেই কাণ্ডকারখানা শুরু হলো।
রবিবার সকাল ঠিক দশটা। নেপাল বাবু দলবল নিয়ে একটা বিশাল ব্যানার টাঙিয়ে হাজির—যেখানে বড় বড় হরফে লেখা:
 "উদ্বোধন করতে আসছেন জনপ্রিয় জননেতা নেপাল বাবু। পুকুর এখন সকলের!" 

একটা টেবিলে লাল ফিতে, কাঁচি আর মাইক নিয়ে বিশাল এলাহি কাণ্ড। পাড়ার মোড়ের ঢাকির দল ঢাক বাজাচ্ছে।
ঠিক তখনই রায় পরিবারের বর্তমান কর্তা—বৃদ্ধ রামকমল বাবু—হাতে একটা পুরনো আমলের ছাতা আর গামছা নিয়ে সোজা হাজির পুকুরঘাটে। তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে চার-পাঁচজন নায়েব-গোমস্তা টাইপের রাগী লোক। 

নেপাল বাবু তখন মাইকে গলা ফাটিয়ে বলছেন, 
"ভাইসব! এতদিন এই পুকুরের জল শুধু একশ্রেণির মানুষ ভোগ করেছে। আজ থেকে এই জল সবার! আসুন, আমরা ফিতে কেটে এই ঐতিহাসিক পুকুর চুরি... এ্যাঁ... মানে ঐতিহাসিক পুকুর উন্মুক্তকরণ উৎসব সম্পন্ন করি!"

রামকমল বাবু খাস গলার কর্কশ স্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন,
 "থামোও ওই মাইক! ফিতে কাটার শখ কার ঘাড়ে কটা মাথা রে? না জানিয়ে আমার ব্যক্তিগত জমিতে এসে এই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো পুকুর চুরি করা হচ্ছে?"

চারপাশের জনতা থমকে গেল। নেপাল বাবু একটু অপ্রস্তুত হয়ে মাইক্রোফোনটা নামিয়ে মুচকি হেসে বললেন, "আরে রামকমল দা! রাগ করছেন কেন? সমাজতন্ত্র বুঝছেন না? রবীন্দ্রনাথ কী বলেছেন? 'সবার উপরে মানুষ সত্য'... পুকুরও তো মানুষেরই! আপনাদের তো আনন্দ হওয়ার কথা।"

"আনন্দ?" রামকমল বাবু চোখ পাকিয়ে বললেন, "আমার পৈতৃক সম্পত্তি বিনা নোটিশে পাবলিক প্রপার্টি বানিয়ে দিচ্ছ, আর আমি নাচে মেতে উঠব? তা ছাড়া, নেপাল বাবু, আপনি তো দেখছি আক্ষরিক অর্থেই 'পুকুর চুরি' কাকে বলে হাতে-কলমে প্রমাণ করে দিচ্ছেন! চুরি তো মানুষে ঘড়ি বা পকেট মারে, আপনি আস্ত একটা পুকুরটাই পকেটে পুরে নিতে চাইলেন!"

উপস্থিত পাবলিক হাসির চোটে তখন পেটে হাত দিয়ে বসে পড়েছে। নেপাল বাবু পড়লেন মহা উভয়সঙ্কটে। একদিকে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলকাচ্ছে, অন্যদিকে রায় বাবু ছাতা উঁচিয়ে তেড়ে আসছেন।
ঠিক তখনই ঘটে এক অদ্ভুত রহস্যজনক ঘটনা! 

নেপাল বাবু যখন জোর করে ফিতে কাটতে যাবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে পুকুরের শান্ত জলে প্রচণ্ড এক শব্দ হলো—'পপ! গপ!' জলের গভীর থেকে একটা বিশাল বুদবুদ উঠতে শুরু করল। আর জলের নিচ থেকে কে যেন গম্ভীর গলায় বলে উঠল, "এই পাজি নেপাল! পুকুরটা কি তোর বাপের যে তুই উদ্বোধন করতে এসেছিস? জল ছাড়ার আগে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিস?" 

নেপাল বাবু ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠলেন। সবাই ভাবল, এ কি তবে কোনো জলপরী বা জলদৈত্যের অভিশাপ? নেপাল বাবুর মুখের রং তখন ফ্যাকাশে।

রামকমল বাবু বাঁকা হেসে বললেন, "ভয় পাবেন না নেপাল বাবু! ওটা কোনো ভূত নয়, আমাদের বংশের পুরোনো বোকো মাছ—যে গত দশ বছর ধরে পুকুরের তলায় লুকিয়ে আছে। সেও জানে, মালিককে না জানিয়ে চুরি করলে কী ফল হয়!" 

নেপাল বাবু বুঝলেন, এখানে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালে মানসম্মান থাকবে না। তিনি মাইক্রোফোনটা ওখানেই ফেলে দৌড়ে দলবল সমেত চম্পট দিলেন। 

তার পর থেকে রামপুরের মানুষ আজও এই ঘটনাকে মনে করে হাসে। আক্ষরিক অর্থে 'পুকুর চুরি' যে এভাবে রাজনৈতিক মঞ্চে রূপ নিতে পারে, তা কেউ কখনো দেখেনি! পুকুরটা আজও রায় পরিবারেরই রয়ে গেল, আর নেপাল বাবুর সেই অসমাপ্ত উদ্বোধনের লাল ফিতেটা ঝুলে রইল একটা শুকনো গাছের ডালে—রহস্যের এক মৌন সাক্ষী হয়ে। 


                                                                                                                            লেখক - আলীম বাবু

No comments:

Post a Comment