দ্বিতীয় ছায়া
দোকানের ভারী লোহার শাটারটা নিচের দিকে টেনে নামিয়ে যখন তালার চাবিটা দু’বার ঘোরালাম, তখন হাতের ঘড়িতে রাত পৌনে বারোটা। ধাতব শাটার আর তালার ঠকঠক শব্দটা রাতের নিস্তব্ধতায় বেশ জোরেই প্রতিধ্বনি তুলে মিলিয়ে গেল। সারাদিনের খরিদ্দারদের কেনাকাটা, হিসাবপত্র আর কেনাবেচার ব্যস্ততার পর শরীরজুড়ে এখন এক চেনা অবশ ভাব।
শীতের দাপট সবে কমতে শুরু করেছে, বসন্তের হাওয়ায় এখন শেষরাতের দিকে হালকা একটা হিমভাব থাকে। আমি হালকা জ্যাকেটের জিপারটা একদম গলা পর্যন্ত টেনে তুলে নিয়ে দুই পকেটে হাত দুটি গুঁজে দিলাম। তারপর পরিচিত গলির মুখে পা বাড়ালাম।
এই গলিটা আমার জন্মসূত্রে চেনা। শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের কত হাজারো স্মৃতি যে জড়িয়ে আছে এই পিচঢালা পথটার সাথে, তার কোনো হিসাব নেই। মোড়ের প্রধান রাস্তা থেকে শুরু হয়ে গলিটা সাপের মতো আঁকাবাঁকা হয়ে দু’পাশের পুরোনো একতলা-দোতলা বাড়িগুলোর মাঝখান দিয়ে সোজা গিয়ে ঠেকেছে আমার বাড়ির কাঠের দরজায়। পৌরসভার পুরোনো মেটাল হ্যালাইডের ল্যাম্পপোস্টগুলো কিছুটা অন্তর অন্তর দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলোর বিষণ্ণ হলুদ আলো মাঝে মাঝেই বাতাসের ঝাপটায় মিটমিট করে ওঠে, যেন কোনো অসুস্থ মানুষের হাঁপানির টান।
চারপাশ একদম জনশূন্য। নির্জন এই রাতে শুধু আমার চটির ‘খসখস’ শব্দ ছাড়া আর কোনো সাড়াশব্দ নেই। দু’পাশের বাড়িগুলোর জানলা বন্ধ, আলো নেভানো। কেবল কোনো কোনো ছাদ থেকে মাঝে মাঝে ক্ষয়ে যাওয়া বসন্তের শুকনো পাতা ঝরে পড়ার শব্দ ছাড়া আর সব নিঝুম।
হাঁটতে হাঁটতে প্রায় গলির মাঝপথে, সেই পুরোনো বিশালাকার আমগাছটার নিচে এসে পৌঁছালাম। গাছটার ডালপালা গলির ওপর ছাতার মতো ছড়িয়ে রয়েছে। ঠিক এইখানটাতেই এসে হঠাৎ আমার কেমন যেন একটা অদ্ভুত খটকা লাগল।
মাথার পেছনের ল্যাম্পপোস্টের তীব্র হলুদ আলোয় আমার দীর্ঘ কালো ছায়াটা সামনের পিচঢালা ভেজা রাস্তায় স্পষ্ট পড়েছে—সেটা অত্যন্ত স্বাভাবিক বিজ্ঞান। কিন্তু একটু নিবিড়ভাবে তাকাতেই আমার বুকের ভেতরটা যেন ছাঁৎ করে উঠল!
আমার ছায়ার ঠিক বাঁ পাশে, হাতখানেক দূরত্বে, আর একটা ছায়া!
একই রকম দৈর্ঘ্য, একই রকম কাঁধের চওড়া ভাব এবং একই রকম জ্যাকেটের অবয়ব নিয়ে আমার ছায়ার সাথে একদম সমান্তরালে হেঁটে চলেছে।
আমার গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে গেল। আমি আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যজনক এবং ভীতিজনক বিষয় হলো—আমার সাথে সাথে সেই দ্বিতীয় ছায়াটাও ঠিক একই মুহূর্তে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল!
বুকের ভেতরটা দুলতে শুরু করেছে। আমি ঢোক গিলে ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকালাম।
পিছনে বহুদূর পর্যন্ত হলুদ আলোয় বাঁধানো ফাঁকা রাস্তা। না কোনো মানুষ, না কোনো কুকুর বা বেড়াল। এমনকী পেছনের ল্যাম্পপোস্টের অবস্থান এমন জায়গায় নয় যে, কোনো আলোকের প্রতিফলনে দুটো আলাদা ছায়া তৈরি হতে পারে। এটা কোনো সাধারণ আলোর অপটিক্যাল ট্রিক বা বৈজ্ঞানিক ভুল হতেই পারে না।
"আমার ভুল হচ্ছে... আলোর বিভ্রম," নিজের মনকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু শুকনো থুতু গিলে আবার যখন পা বাড়ালাম, দেখলাম ছায়াটাও আমার পাশে পাশে মসৃণভাবে এগিয়ে চলেছে। মাটি স্পর্শ না করেই যেন রাস্তার বুকে ভেসে চলেছে একখণ্ড নিবিড় অন্ধকার।
আমি আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলাম না। ভয়ের এক তীব্র সংক্রামক আতঙ্ক আমাকে গ্রাস করল। আমি পায়ের গতি বাড়ালাম, তারপর প্রায় বেপরোয়া হয়ে দৌড়তে শুরু করলাম।
আমার পা যেমন পিচের রাস্তার ওপর সজোরে আছড়ে পড়ছে, রাস্তার বুকে সেই আঁধার থেকে উঠে আসা দ্বিতীয় ছায়াটাও ঠিক ততটাই হিংস্র ও অবিশ্বাস্য বেগে আমার সাথে সাথে ছুটে চলেছে। মনে হচ্ছে ওটা কোনো সজীব সত্তা, যা মাটি থেকে উপড়ে এসে আমাকে আস্ত গিলে খেতে চায়!
আমার শ্বাস দ্রুত হয়ে এলো, ফুসফুসে বাতাসের ঘাটতি দেখা দিল। ঠিক তখনই... আমার একদম বাঁ কানের কাছে বরফশীতল, অতিপ্রাকৃতিক একটা নিঃশ্বাস এসে পড়ল।
বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ ছাপিয়ে একটা অমানবিক, হিমশীতল ফিসফিসানি একদম স্পষ্ট কানে বেজে উঠল—
"সেদিনও তো এভাবেই পালিয়ে গিয়েছিলে, তাই না? সত্যকে আড়াল করতে এতদিন পর আজ আর দৌড়ে কী লাভ?"
কথাটা শোনামাত্র আমার হাঁটুর জোর যেন এক লহমায় উধাও হয়ে গেল। গলার স্বরটা অবিকল আমার নিজের গলার মতো! কিন্তু তার মধ্যে লুকিয়ে আছে এক চরম আক্রোশ আর হিমশীতল শূন্যতা।
আজ থেকে ঠিক চার বছর আগের এক ঝড়বৃষ্টির রাত আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে একা শুয়ে থাকা আমার পিসতুতো ভাই বাবলুর সেই শেষ মুহূর্তগুলো... যা আমি ছাড়া আর কেউ জানত না। বাবলুর মৃত্যুর পেছনের সেই গোপন সত্য এবং আমার চরম স্বার্থপরতা যা আমি এতদিন পৃথিবীর সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছি—আজ এই নিঝুম অন্ধ গলির বুকে কে তা উচ্চারণ করল?
ভয়ে, তীব্র অনুশোচনায় এবং অমানবিক আতঙ্কে আমার চোখের সামনে সব কিছু ধোঁয়াটে হয়ে এলো। মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল, মনে হলো চারপাশের ঘরবাড়ি, রাস্তা, ল্যাম্পপোস্ট সব যেন এক তীব্র ঘূর্ণিপাকে ঘুরছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকগুলো মগজের ভেতর কানফাটা চিৎকারে রূপ নিল... আমি ভারসাম্য হারিয়ে ধপ করে পিচের শক্ত রাস্তার ওপর পড়ে গেলাম। চেতনা ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন হয়ে এলো অন্ধকারে।
"অ্যাই! শোনো! রাস্তার ওপর এভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে আছ কেন? শরীর ঠিক আছে তো তোমার?"
কারোর শারীরিক স্পর্শের বদলে এক তীব্র ঝাঁকুনিতে আমার চেতনার দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল।
চোখ মেলে তাকাতেই দেখলাম, ভোরের ধোঁয়াটে আলো চারপাশকে খানিকটা স্পষ্ট করে তুলেছে। মাথায় পেপারের বড় বান্ডিল নিয়ে রতনদা আমার কাঁধ ধরে ঝাঁকাচ্ছে। আমি ভিজে রাস্তার ওপর শুয়ে আছি, পাশে আমার ধুলোবালি লাগা জ্যাকেটটা খুলে পড়ে রয়েছে। পূব আকাশে হালকা লালচে সূর্যের দ্যুতি ছড়াচ্ছে, আর রাস্তার মেটাল হ্যালাইডের হলুদ আলোগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
আমি হন্তদন্ত হয়ে ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। মাথাটা তখনও প্রচন্ড ভারী। হাত-পা কাঁপছে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে চারপাশের গলির দিকে তাকালাম—কোথাও কোনো অদ্ভুত ছায়া নেই, সেই হিমশীতল কণ্ঠস্বরও নেই। সব কিছু শান্ত, চেনা ভোরের অতি পরিচিত পৃথিবী।
রতনদা অবাক হয়ে বলল, "কী ব্যাপার হে? কাল রাতে কি দোকানে বেশি চাপ ছিল? রাস্তার ওপর জ্যাকেট ফেলে ঘুমোচ্ছিলে!"
"নাহ্... না রতনদা, এমনি একটু মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলাম," অতিকষ্টে শব্দগুলো উচ্চারণ করলাম।
রতনদা পেপার দিতে দিতে এগিয়ে চলে গেল। আমি মাটিতে পড়ে থাকা জ্যাকেটটা তুলে নিয়ে গায়ে জড়াতে গেলাম। কিন্তু ঠিক তখনই আমার হাত দুটো বরফের মতো জমে গেল।
জ্যাকেটের পেছনের কালো কাপড়ের ধুলো আর হালকা কুয়াশার আস্তরণের ওপর দুটি হাতছাপ স্পষ্ট ফুটে রয়েছে—ঠিক যেন কেউ শেষ মুহূর্তে পেছন থেকে আমাকে দু’হাতে শক্ত করে চেপে ধরেছিল! আর সেই হাতছাপ দুটো সাধারণ কোনো মানুষের হাতের নয়, তার আঙুলগুলো অস্বাভাবিক রকমের লম্বা ও সরু।
আমার বুকের ভেতরটা আবার প্রবল বেগে দুলতে লাগল।
ধীর, কম্পিত পায়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম বটে, কিন্তু মনের গভীর থেকে সেই বিষাক্ত, অশুভ ফিসফিসানিটা কিছুতেই মুছল না। আমি বুঝতে পারলাম, সূর্যের আলো ফুটলে হয়তো অশুভ ছায়ারা কিছুক্ষণের জন্য আড়ালে চলে যায়... কিন্তু রাত আবার নামবে। গলিটা আবার নিঝুম হবে, ল্যাম্পপোস্টগুলো আবার মিটমিট করে জ্বলবে। আর সেই দ্বিতীয় ছায়াটা ঠিক ফিরে আসবে—চার বছরের পুরোনো সেই অমীমাংসিত হিসাব চুকিয়ে নিতে।
লেখক - আলীম বাবু


No comments:
Post a Comment