বাংলা গল্পসল্প

"BanglaGolpoSolpo" is all about Bengali stories, Bengali Poems, Articles etc. 'বাংলা গল্পসল্প'র তরফ থেকে সকল পাঠকগণ, শ্রোতাগণ ও লেখকবন্ধুদের জানাই হার্দিক অভিনন্দন, ভালোবাসা, প্রীতি ও শুভেচ্ছা এবং শুভকামনা। এই অনলাইন পাবলিশিং ওয়েবসাইটটির অনবদ্য প্রচেষ্টা স্বরূপ বিভিন্ন ধরনের বাংলা সাহিত্যের উন্মোচনের মাধ্যমে বাংলা জগতের গর্বিত বাঙালীর সন্নিকটে নবাগত তরুণ প্রজন্মের সাহিত্যিকগণের আত্মপ্রকাশ করার নিতান্তই একটি প্রয়াসমাত্র ।

Wikipedia

Search results

Pageviews

নিচের follow button টির দ্বারা আপনি এই ওয়েবসাইট টি follow করতে পারেন ।

Thursday, 30 July 2026

ডান দিকে নাকি বাম দিকে / 'বাংলা গল্পসল্প' নিবেদিত একখানা ছোট্ট রোমাঞ্চকর গল্প ।

ডান দিকে নাকি বাম দিকে

ভুলগঞ্জ বাজারের মোড়টা আজ সকাল থেকেই অন্যরকম থমথমে। আকাশে রোদ উঠেছে কি ওঠেনি, তার আগেই চায়ের দোকানে এসে হাজির হয়েছেন রিটায়ার্ড মাস্টারমশাই গোবিন্দ বাবু। পকেটে তাঁর স্ত্রীর দেওয়া লম্বা বাজার ফর্দ—আলু, পটল, আধ কিলো মুসুর ডাল আর এক প্যাকেট চা পাতা। কিন্তু সমস্যা হলো, বাজারের দিকে যাওয়ার যে সোজা রাস্তাটা, তার ওপর আজ দুটি বিশাল ব্যানার টাঙানো হয়েছে।

বাঁ দিকের ল্যাম্পপোস্টে সাঁটানো লাল ব্যানার—তাতে লেখা:
 "বিপ্লব মানেই বাম দিক! সোজা চলো না, বাঁকা পথে নয়, সাম্য আসবে বাঁ দিক দিয়েই!"

আর ডান দিকের চায়ের দোকানে টাঙানো গেরুয়া ব্যানার—তার ওপর বড় বড় হরফে মোড়া:
 "উন্নয়ন মানেই ডান দিক! প্রগতির চাকা ডানেই ঘোরে!"

মাঝখানে দাঁড়িয়ে গোবিন্দ বাবু। সোজা গেলে সোজা বাজারে পৌঁছানো যায়, হাঁটার পথ মোটে পাঁচ মিনিট। কিন্তু গত দুদিন ধরে এলাকার দুই দলের দাদারা কড়া নির্দেশ জারি করেছেন—এলাকার কোনো নাগরিক সোজা হাঁটতে পারবেন না। হয় ডান দিক, নয়তো বাম দিক বেছে নিতে হবে। নিরপেক্ষ থাকার কোনো জায়গা নেই। 

গোবিন্দ বাবু চশমাটা নাক থেকে একটু ওপরে তুলে বাঁ দিকে এক পা বাড়ালেন।
অমনি লাল গামছা কাঁধে এক তরুণ তেড়ে এল, "কী ব্যাপার মাস্টারমশাই? বাঁ দিকে পা বাড়ালেন বটে, কিন্তু পকেটে তো পুঁজির পকেটমারি করা বাজারের থলি ঝুলছে! সর্বহারার দেশে দাঁড়িয়ে বুর্জোয়াদের আলু কিনবেন? ওদিকে যাওয়া চলবে না!"

ভয়ে গোবিন্দ বাবু পা পিছিয়ে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ডান দিক থেকে একদল লোক এসে তাঁকে প্রায় কাঁধে তুলে নেওয়ার উপক্রম করল, "আসুন, আসুন! মাস্টারমশাই ডান দিকে আসুন! ডাইনে না চললে দেশ রসাতলে যাবে!"

গোবিন্দ বাবু আমতা আমতা করে বললেন, "কিন্তু ভাই, বাজার তো সোজা গেলে সোজা..."

"সোজা মানেই তো পথভ্রষ্টতা!" ডান দিকের নেতা ধমকে উঠলেন, "সোজা চললে তো আপনি অতীতে ফিরে যাবেন। আমাদের সাথে ডাইনে চলুন, ফিউচার দেখিয়ে দেব!"

উভয়সঙ্কটে পড়ে গোবিন্দ বাবুর কপালে ঘাম দেখা দিল। তিনি ডান দিকে তাকাচ্ছেন তো দেখছেন রাস্তাটা সোজা গিয়ে একটা গভীর নর্দমায় মিশেছে। আবার বাম দিকে তাকাচ্ছেন তো দেখছেন সেখানে একটা ভাঙা দেওয়ালের ওপর লেখা—"এ পথ সে পথ নয়, ভুল পথে স্বাগতম!"

ঠিক তখনই গলির মোড় থেকে উদয় হলো পাগলা খগেন। খগেনের মাথায় সবসময় একটা টিনের কৌটো উল্টো করে বসানো থাকে। সে গোবিন্দ বাবুর সামনে এসে দাঁড়াল এবং রহস্যময় গলায় ফিসফিস করে বলল, "মাস্টারমশাই, ডান দিকও মিথ্যে, বাম দিকও ফাঁকি। আসল রাস্তা হলো ওপরের দিকে!"

"ওপরের দিকে মানে?" গোবিন্দ বাবু অবাক হলেন।

"আকাশের দিকে! ঘুড়ি হয়ে উড়ে যান!" খগেন খিকখিক করে হেসে একটা লাল আর একটা গেরুয়া রঙ একসঙ্গে গুলে গোবিন্দ বাবুর কপালে তিলক কেটে দিল। 

এবার দুই দলের নেতাই একসঙ্গে তেড়ে এল—"উনি কার পক্ষে? ডান না বাম? পরিষ্কার বলুন!"

গোবিন্দ বাবু তখন এক অদ্ভুত চাল চাললেন। তিনি দুই নেতার কাঁধে হাত রেখে গম্ভীর গলায় বললেন, "শোনো বাবাজিরা, অঙ্কশাস্ত্র বলে পৃথিবী হলো গোল। তোমরা যদি জোর করে ডান দিকেই হাঁটতে থাকো, তবে ঘুরতে ঘুরতে ঠিক এই বাম দিক দিয়েই ফিরে আসবে। আর যদি বাম দিকে হাঁটো, তবে গিয়ে ঠেকবে ওই ডান দিকেই। সুতরাং ডান আর বাম আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ!" 

নেতারা দুজনে কিছুক্ষণ হা করে গোবিন্দ বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের মাথায় এহেন জটিল দার্শনিক প্যাঁচ হজম হচ্ছিল না। তারা যখন মাথা চুলকোচ্ছে, সেই সুযোগে গোবিন্দ বাবু সন্তর্পণে এক পা পিছিয়ে একেবারে সোজা রাস্তার দিকে ভোঁ দৌড় দিলেন।

পেছনে তখন শুরু হয়ে গেছে তুমুল বিতর্ক—ডান দিক কি আসলে বাম দিক, নাকি বাম দিকটাই ডান দিক?

কুয়াশাবৃত ভুলগঞ্জ বাজারের রাস্তায় গোবিন্দ বাবু ফর্দ হাতে সোজা হেঁটে চলেছেন। তাঁর পেছনে দুই দলের স্লোগান ক্রমশ মিলিয়ে আসছে, আর সামনে পড়ে আছে এক অন্তহীন রাস্তা—যার কোনো ডান নেই, বাম নেই, কেবল সামনে এগিয়ে চলার এক অদ্ভুত রহস্যময় হাতছানি।  


                                                                                                                       লেখক - আলীম বাবু

No comments:

Post a Comment