বাংলা গল্পসল্প

"BanglaGolpoSolpo" is all about Bengali stories, Bengali Poems, Articles etc. 'বাংলা গল্পসল্প'র তরফ থেকে সকল পাঠকগণ, শ্রোতাগণ ও লেখকবন্ধুদের জানাই হার্দিক অভিনন্দন, ভালোবাসা, প্রীতি ও শুভেচ্ছা এবং শুভকামনা। এই অনলাইন পাবলিশিং ওয়েবসাইটটির অনবদ্য প্রচেষ্টা স্বরূপ বিভিন্ন ধরনের বাংলা সাহিত্যের উন্মোচনের মাধ্যমে বাংলা জগতের গর্বিত বাঙালীর সন্নিকটে নবাগত তরুণ প্রজন্মের সাহিত্যিকগণের আত্মপ্রকাশ করার নিতান্তই একটি প্রয়াসমাত্র ।

Powered By Blogger

Wikipedia

Search results

Pageviews

নিচের FOLLOW BUTTON টির দ্বারা আপনি ওয়েবসাইটটি FOLLOW করতে পারেন।

Wednesday, 12 August 2026

উল্টোডিহির উপাখ্যান / 'বাংলা গল্পসল্প' নিবেদিত একখানা রোমাঞ্চকর গল্প ।

উল্টোডিহির উপাখ্যান

একদা এক মহাজাগতিক দুপুরবেলায়, যখন সময়টা ঘড়ির কাঁটা ছেড়ে পিছলে নিচে পড়ে গিয়ে একটা বাটি-আইসক্রিম হয়ে জমে গিয়েছিল, ঠিক তখনই ‘উল্টোডিহি’ গ্রামে চরম গোলমালটা বাঁধল। গ্রামের সব রাস্তা আজ হঠাৎ করে নিজেদের দিক পরিবর্তন করে ফেলেছিল। উত্তর দিকে হাঁটলে মানুষ পৌঁছে যাচ্ছিল সরাসরি নিজের শৈশবের প্রথম ভুলটা যেখানে হয়েছিল ঠিক সেখানে, আর দক্ষিণ দিকে হাঁটলে সবাই গিয়ে পড়ছিল একটা বিশাল, হাওয়ায় ভাসমান চা-এর কাপের ভেতর। 

গ্রামে বাস করত তিন অদ্ভুত প্রাণী। প্রথমজন—এক চোখের খঞ্জর সিং। ইনি কাঠ দিয়ে তৈরি একটা চোখঢাকা পরতেন আর বিশ্বাস করতেন যে, পৃথিবীটাকে যদি খোলা চোখে পুরোটা দেখে ফেলা হয়, তবে তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা আসল সত্যটা উবে যাবে। দ্বিতীয়জন—উড়ন্ত বেগুনি হাতির বাচ্চা ‘গোপাল’। গোপালের পিঠে কোনো ডানা ছিল না, সে কেবল নিজের কান দুটোকে অসম্ভবের বাতাসে ঝাপটে শূন্যে ভেসে থাকত। আর তৃতীয় প্রাণীটি হলো একটা বোতাম-পড়া বিড়াল, নাম তার ‘লঙ্কা’। লঙ্কা কখনো মুখে কথা বলত না; তার গলার কাছে জ্বলতে থাকা একটা সোনালী বোতাম থেকে বেরিয়ে আসত নানারকম অস্ফুট শব্দের প্রতিধ্বনি। 

সেদিন সকালে খঞ্জর সিং তাঁর কাঠের চশমাটার ওপর হাত বোলাতেই দেখলেন, সেখান থেকে নীল রঙের এক থোকা ধোঁয়া বেরোচ্ছে। ধোঁয়ার গন্ধটা একদম ভাঙা প্রতিশ্রুতির মতো তেঁতো। তিনি গোপালকে ডেকে বললেন, "দেখলি গোপাল? বাতাসটা আজকে ভারী হয়ে গেছে। নির্ঘাত কোথাও কোনো মানুষ নিজের ছায়া হারিয়ে ফেলেছে!" 

গোপাল হাওয়ায় তিনটে ডিগবাজি মেরে বলল, "ছায়া তো হারিয়ে যায় না সিংজি, ছায়া আসলে মানুষের ভেতরের অন্ধকার, যা বাইরে বেরিয়ে আসার সুযোগ না পেয়ে জমে বরফ হয়ে যায়!" 

ঠিক তখনই এক হাতে একটা ভাঙা আয়না আর অন্য হাতে একটা মস্ত কাঁচের বয়াম নিয়ে হাজির হলো বোতাম-পড়া বিড়াল লঙ্কা। তার গলার বোতামটা থেকে অদ্ভুত এক যান্ত্রিক শব্দে ধ্বনিত হলো—"আজ গ্রামের পশ্চিম প্রান্তের সেই পুরোনো অতিপ্রাকৃত দেয়ালটা হঠাৎ কাঁদার শব্দ করেছে! যে দেয়াল কখনো ছিলই না, সে যদি কাঁদে, তবে বুঝতে হবে দৃশ্যমান জগৎটা তার সীমানা ভুলে গেছে!" 

কথাটা শুনে খঞ্জর সিং চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি নিজের পকেট থেকে একটা জং ধরা মরচে-পড়া চামচ বের করে মাটি খুঁড়তে শুরু করলেন। কারণ উল্টোডিহির একটা প্রাচীন অলিখিত নিয়ম ছিল: যখন কোনো অদৃশ্য বস্তু কেঁদে ওঠে, তখন দৃশ্যমান কোনো কিছুকে খুঁড়ে বের না করলে বিশ্বজগতের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। 

তিনজনে মিলে রওনা হলো সেই অদৃশ্য দেয়ালের উদ্দেশ্যে। কিন্তু উল্টোডিহির পথ চলা মোটেও সহজ ছিল না। রাস্তায় তাদের সঙ্গে দেখা হলো এক বিশাল মেছো ভূতের। ভূতটা একটা উল্টো হয়ে থাকা অসশ্বথ গাছের ডালে ঝুলে ঝুলে খালি বাতাসে অদ্ভুত এক চশমা দিয়ে অদৃশ্য জল খাচ্ছিল। 

মেছো ভূত তাদের দেখে বিকট শব্দে হেসে উঠে বলল, "তোমরা কোথায় যাচ্ছ হে অতিপ্রাকৃত জীবেরা? এই পথে যে হেঁটে যায়, সে নিজের নাম ভুলে যায়। আর যে নাম ভুলে যায়, তাকে তো আর কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যায় না!" 

লঙ্কা তার চোখের তারা দুটোকে গোল গোল করে ঘোরালো। তার গলার বোতাম থেকে আওয়াজ এলো—"যে নাম আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে, সে তো কেবল এক টুকরো অক্ষরের দাস। যে নিজের নাম ভুলতে পারে, সেই তো আসলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অংশ হতে পারে!" 

মেছো ভূত এই অদ্ভুত কথা শুনে কিছু মুহূর্ত স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে নিজের মেছো অস্তিত্ব আর দর্শনের দ্বন্দ্ব সহ্য করতে না পেরে হঠাৎ একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে পরিণত হয়ে একটা বিশাল মিষ্টির থালার রূপ নিল। কিন্তু সেই থালায় কোনো মিষ্টি ছিল না; ছিল কেবল কতগুলো ছোট ছোট প্রশ্নচিহ্ন। 

তিনজন সেই প্রশ্নচিহ্নগুলোকে টপকে এগিয়ে চলল। হাঁটার পথেই তাদের পা আটকে গেল একটা বিশাল ছায়ার ভেজা জলাভূমিতে। সেই জলাভূমির মাটিটা আর কিছুই নয়, কেবল মানুষের ভুলে যাওয়া পুরোনো স্মৃতি দিয়ে তৈরি। গোপাল কান নেড়ে সেগুলোকে সরিয়ে পথ করে নিচ্ছিল। 

অবশেষে তারা পৌঁছাল সেই অদৃশ্য দেয়ালটার সামনে। দেয়ালটি সত্যিই দৃশ্যমান না হলেও, বাতাসে একটা শূন্যতার অবয়ব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। দেয়ালটি থরথর করে কাঁপছিল আর তা থেকে ঝরে পড়ছিল পারদের মতো জল। 

খঞ্জর সিং তাঁর পকেটের সেই চামচটা দিয়ে শূন্যে একটা অদ্ভুত বৃত্ত আঁকলেন। গোপাল বাতাসে লেজ নেড়ে চারপাশটা ঘিরে ফেলল, আর লঙ্কা তার হাতের কাঁচের বয়ামটা খুলে দেয়ালের সেই অদৃশ্য কান্নার শব্দটাকে ভেতরে পুরে ফেলল। 

আশ্চর্যের বিষয়, বয়ামের মুখটা বন্ধ করতেই চতুর্দিক একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দেয়ালটার গায় থেকে ঝরে পড়ল কতগুলো কাঠের টুকরো আর শুষ্ক পাতা।
গোপাল একটা কাঠের টুকরো শুঁকে দেখে বলল, "সিংজি, এই অযৌক্তিক যাত্রার শেষ কোথায়? এই অন্ধ দেয়ালটা কেন কাঁদছিল?"

খঞ্জর সিং তাঁর কাঠের চশমাটা একটু উঁচু করে শূন্যতার দিকে তাকালেন। পরম গম্ভীর কণ্ঠে তিনি বললেন, "গোপাল, মানুষ যা কিছু খালি চোখে দেখতে পায় না, তাকেই অযৌক্তিক বলে দূরে ঠেলে দেয়। এই দেয়ালটা আসলে মানুষের সেইসব অসীম অনুভূতির সমষ্টি, যার কোনো ব্যাকরণ নেই, কোনো যুক্তি নেই। আমরা যাকে হাসির পাত্র ভাবি, যা কিছুকে বেমানান আর ভিত্তিহীন মনে করি—তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে পরম সত্য। যুক্তি দিয়ে কেবল বস্তুকে মাপা যায়, কিন্তু শূন্যতাকে বুঝতে হলে যুক্তিহীনতার গভীরে ডুব দিতে হয়। যে ভাঙা আয়নায় নিজেকে স্পষ্ট দেখতে চায়, সে কেবল রূপ দেখে; কিন্তু যে অন্ধকারের মাঝেও পথ খোঁজে, সে আলোর উৎস হয়ে ওঠে।" 

লঙ্কার বোতাম থেকে তখন আর কোনো শব্দ বেরোচ্ছিল না, কেবল এক মৃদু, স্নিগ্ধ আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ছিল পুরো উল্টোডিহি গ্রামে। আকাশে ভেসে থাকা বেলুন-গাছগুলো থেকে শুরু হলো নীরবতার বৃষ্টি। 

বাস্তবের কোনো নিয়ম না মেনে, কোনো জাগতিক ব্যাকরণের ধার না ধেরে, উল্টোডিহির এই তিন অদ্ভুত চরিত্র বুঝতে পারল—যে গল্পের কোনো মানে নেই, সেই গল্পের প্রতিটি ফাঁকেই আসলে লুকিয়ে থাকে জীবনের সবচেয়ে বড় মানেটা। সব সহজ উত্তর যেখানে শেষ হয়, ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয় পরম শিক্ষার আসল যাত্রা। 

                                                                                                                        লেখক - আলিম বাবু

No comments:

Post a Comment