বাংলা গল্পসল্প

"BanglaGolpoSolpo" is all about Bengali stories, Bengali Poems, Articles etc. 'বাংলা গল্পসল্প'র তরফ থেকে সকল পাঠকগণ, শ্রোতাগণ ও লেখকবন্ধুদের জানাই হার্দিক অভিনন্দন, ভালোবাসা, প্রীতি ও শুভেচ্ছা এবং শুভকামনা। এই অনলাইন পাবলিশিং ওয়েবসাইটটির অনবদ্য প্রচেষ্টা স্বরূপ বিভিন্ন ধরনের বাংলা সাহিত্যের উন্মোচনের মাধ্যমে বাংলা জগতের গর্বিত বাঙালীর সন্নিকটে নবাগত তরুণ প্রজন্মের সাহিত্যিকগণের আত্মপ্রকাশ করার নিতান্তই একটি প্রয়াসমাত্র ।

Wikipedia

Search results

Pageviews

নিচের follow button টির দ্বারা আপনি এই ওয়েবসাইট টি follow করতে পারেন ।

Thursday, 6 August 2026

‘বিষাক্ত মেলবন্ধন’ / 'বাংলা গল্পসল্প' নিবেদিত একখানা ছোট্ট রোমাঞ্চকর গল্প । ছোটোগল্প।

বিষাক্ত মেলবন্ধন

গ্রামের দক্ষিণ মাথার মরা নদীটা যেখানে হাঁটু কাদা আর কাশবোনের জঙ্গলে গিয়ে মিশেছে, ঠিক সেখানটিতেই কালাচাঁদ সাপুড়ের ডেরা। বাঁশের চারটে খোঁটা, তার ওপর তালপাতার ছাউনি আর চাটাইয়ের বেড়া। বয়স পঁচাত্তর পার হয়েছে কালাচাঁদের। গায়ের চামড়া রোদ-বৃষ্টির ঝাপটায় শুকিয়ে যাওয়া কদম গাছের ছালের মতো খসখসে আর কালো। কিন্তু তার চোখ দুটি দুটো মরা কাঁচের গুলির মতো নিষ্পলক, গভীর।
কালাচাঁদের সঙ্গী বলতে ওই একটা কাঠের পেটরা। মেহগনি কাঠের তৈরি পুরোনো সেই পেটরার ভেতর নিঃশব্দে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে ‘চন্দ্রবোড়া’। সাধারণ বিষধর সাপ নয় ওটা—আঁশগুলোর ওপর রক্তচন্দনের রঙের গোল গোল ছাপ, হিংস্র চ্যাপ্টা মাথা আর নিঃশ্বাসের মধ্যে এক অদ্ভুত শীৎকার। কালাচাঁদ তার নাম রেখেছে ‘রক্তমণি’।
দশ বছর আগে সুন্দরবনের খাঁড়ির এক গহীন গোলপাতা বনে রক্তমণিকে ধরেছিল কালাচাঁদ। তখন ওটা এক বিঘত লম্বা একটা বাচ্চা। সাপুড়েদের পুরোনো ঝুলিতে কত শাঁখামুঠি, কেউটে, গোখরো এসেছে আর গেছে, কিন্তু রক্তমণিকে কালাচাঁদ কখনো হাটে-বাজারে হাঁড়ি খুলে নাচায়নি। লোক হাসাতে বিষদাঁত ভাঙেনি, বিষের পুঁটুলি গাল টিপে নিংড়ে নেয়নি। কালাচাঁদ বলত, “রক্তমণি নাচনেওয়ালা ডুগডুগির বাঁদর নয়। ও রাজচক্রবর্তী। ওর রাগ আছে, ওর তেজ আছে।”
কালাচাঁদ আর রক্তমণির সম্পর্কটা কোনো মালিক আর পোষা প্রাণীর মতো ছিল না। সেটা ছিল দুটো একা, বিষাক্ত, নিষ্পাপ আত্মার মধ্যকার এক নীরব চুক্তি। কালাচাঁদ যখন একলা রাতে বোবা কুপিটা জ্বেলে ঝিঁঝিঁর ডাক শুনত, তখন পেটরা খুলে রক্তমণিকে বের করে নিজের চওড়া অনাবৃত বুকের ওপর ছেড়ে দিত। ঠাণ্ডা, সর্পিল মেদহীন শরীরটা যখন কালাচাঁদের পাজরের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে এঁকেবেঁকে উঠত, কালাচাঁদ চোখ বুজে অনুভব করত এক গভীর, শীতল তৃপ্তি। মানুষ তাকে ভয় পেত, মানুষ তাকে ঘেন্না করত, দূর থেকে বাঁশের কেল্লা বানিয়ে সাপুড়ে বলে কটু কথা বলত। একমাত্র এই বিষধর রক্তচক্ষু প্রাণীটাই তাকে কোনোদিন মিথ্যে ছদ্মবেশ পরায়নি।
বর্ষা শেষ হয়ে তখন আশ্বিনের হিম পড়তে শুরু করেছে। গ্রামের মুখোপাধ্যায় বাড়ির মেজবাবু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সাপে কেটেছে তা নয়, তীব্র জ্বর আর গায়ে যন্ত্রণা। কিন্তু চালচলন বদলে গেছে। গাঁয়ের লোক রটিয়ে দিল—বাড়ির পুরোনো ভিটেয় যে বাস্তুসাপ থাকে, মেজবাবু নাকি ভুল করে তার ওপর পা তুলে দিয়েছিলেন। ব্যস, অমঙ্গল তাড়াতে হবে। ডাক পড়ল কালাচাঁদের।
মেজনায়কের উঠোনে লোক গিজগিজ করছে। কালাচাঁদ কাঠের পেটরাটা কাঠে বসিয়ে ধূপ জ্বালাল। মেজবাবু বারান্দায় মাদুরে শুয়ে কাঁঁপছেন। কালাচাঁদ কিন্তু কোনো জাদুটোনা বা মন্ত্র পড়তে আসেনি। সে শুধু তার রক্তমণিকে বের করল।
ঝিলমিলে আশ্বিনের রোদে রক্তমণির চামড়ার রক্তচন্দনের ছাপগুলো যেন জ্বলতে লাগল। সে ফণা তুলল না, শুধু মাথাটা উঁচু করে ভিড়ের মানুষগুলোর দিকে একপলক তাকাল। তার ছোট ছোট দুটো বিষাক্ত চোখের মধ্যে ফুটে উঠল এক অনন্ত অবজ্ঞা।
কালাচাঁদ হাতের তুড়ি বাজিয়ে মৃদুকণ্ঠে বলল, “যা বাবা, ভিটে পরিষ্কার করে দে। কাউকে মারিস না, শুধু নিজের অস্তিত্বটুকু জানান দিয়ে আয়।”
রক্তমণি ধীরগতিতে উঠোন পেরিয়ে, ইটের ফাটল গলে সোজা বাড়ির পুরোনো সিঁড়ির নিচে অন্ধকারের ভেতর সেঁধিয়ে গেল। মিনিট দশেক কোনো শব্দ নেই। ভিড়ের মানুষের নিঃশ্বাস বন্ধ। হঠাৎ সিঁড়ির তলা থেকে শোনা গেল এক তীব্র সাপের গোঙানি—যেন দুটো প্রাচীন বিষধর জীব মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এক অদ্ভুত খসখস শব্দ, মাটির পাত্র ভাঙার আওয়াজ, তারপর সব নিস্তব্ধ।
কিছুক্ষণ পর রক্তমণি বেরিয়ে এল। কিন্তু তার স্বাভাবিক গতি ছিল না। তার মসৃণ আঁশগুলোর ওপর থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছে, আর শরীরটা দু-এক জায়গায় ভীষণভাবে দুমড়ে গেছে। কালাচাঁদ ধড়ফড় করে এগিয়ে গেল। হাতে করে রক্তমণিকে তুলে নিয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল। মেজবাড়ির লোক চিৎকার করে উঠল, “ওটাকে মার! ওই সাপটাই তো কালসাপ!”
কালাচাঁদ কাউকেও একটা কথা বলল না। নিজের ঝুলি আর রক্তমণিকে বুকে আঁকড়ে ধরে সোজা হাঁটতে শুরু করল তার ডেরার দিকে। পেছনে ছড়িয়ে রইল মানুষের শোরগোল, সন্দেহ আর ভয়ের গুঞ্জন।
সে রাতে প্রচণ্ড ঝড় নামল। আশ্বিনের অকালবৃষ্টি কালাচাঁদের তালপাতার কুঁড়েঘরটাকে কাঁপিয়ে দিতে লাগল। ঘরের ভেতর কুপিটা বারবার নিভে যাচ্ছে।
কালাচাঁদ মেহগনি কাঠের পেটরার ওপর রক্তমণিকে শুইয়ে দিয়ে বুনো লতাপাতার রস বাটি করে এনে তার গায়ে মাখিয়ে দিচ্ছিল। রক্তমণির গায়ের রক্ত শুকিয়ে গেছে, কিন্তু তার চোখের আলোটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। সাপের চোখের সেই হিংস্র, তেজস্বী তারা দুটো এখন এক অদ্ভুত করুণ আকুতিতে কালাচাঁদের মুখটার দিকে চেয়ে আছে।
কালাচাঁদ নিচু হয়ে রক্তমণির মাথার কাছে মুখ নিয়ে গেল। ফিসফিস করে বলল, “তোর খুব কষ্ট হচ্ছে, না রে? আমি জানি, ওটা গৃহবাস্তু ছিল। তুই ওকে মারিসনি, ও-ও তোকে মারেনি। তোরা শুধু অঞ্চল ভাগ করে নিয়েছিস। কিন্তু মানুষ তোদের বুঝল না... মানুষ আমাকেও বুঝল না, তোকেও না।”
রক্তমণি হালকা একটু জিভ বের করে কালাচাঁদের কপালে ছোঁয়াল। সাপ যে এত শীতল হতে পারে, কালাচাঁদ আগে কখনো ভাবেনি। সেই স্পর্শে যেন কোনো বিষ ছিল না, ছিল এক পরম নির্ভরতা।
হঠাৎ বাতাসটা থমকে গেল। বৃষ্টির শব্দ কমে এল। কালাচাঁদ অনুভব করল, রক্তমণির নরম ও ঠাণ্ডা শরীরটা সম্পূর্ণ শিথিল হয়ে গেছে। তার বিষাক্ত রাজচক্রবর্তী দোসর আর শ্বাস নিচ্ছে না।
কালাচাঁদ কান্নাকাটি করল না। সাপুড়েরা সাপের মরণে কাঁদে না, কারণ তারা জানে বিষের শেষ পরিণতি নীরবতা। সে কোনো কোদাল নিল না। গভীর রাতে, বৃষ্টিভেজা অন্ধকারে সে রক্তমণির নিথর দেহটা নিজের গামছায় জড়াল। তারপর পেটরাটা খালি করে সেটা কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটা দিল মরা নদীর দিকে।
পরদিন সকালে গ্রামের লোক দেখল কালাচাঁদের কুঁড়েঘরটা খালি পড়ে আছে। ভেতরটা লণ্ডভণ্ড, বাঁশের দরজাটা হাওয়ায় দুলছে।
ঘাটের কাছে মরা নদীর কাদা-জলে একটা কাঠের পেটরা ভাসছিল। পেটরাটার মুখ খোলা, তার ভেতর কিছুই নেই। আর নদীর ধারের ভিজো বালিতে শুধু একজোড়া খালি পায়ের ছাপ চলে গেছে গভীর নদীর জলের দিকে। সেই পায়ের ছাপ আর ফিরে আসেনি।
গ্রামের মানুষ বলে, কালাচাঁদ নাকি আর বাঁচেনি, বিষাক্ত বিষের নেশায় নদীকে সমর্পণ করেছে নিজেকে। আবার কেউ কেউ রাতের আঁধারে মরা নদীর ধারে যেতে ভয় পায়। তারা বলে, নিঝুম রাতে যখন বাঁশবনে হাওয়া লাগে, তখন নাকি দূর থেকে একটা বিনের আওয়াজ ভেসে আসে। আর সেই সুরের টানে নাকি একটা মস্ত রক্তচন্দনের রঙের সাপ নদী পার হয়ে ভেসে বেড়ায় কাদার ওপর।
কিন্তু সত্যিটা কী? কালাচাঁদ কি সত্যিই নিজের ভালোবাসার সাপের সাথে নদীর অতলে তলিয়ে গেছে? নাকি রক্তমণিকে সত্যি কোনো নির্জন বনে মুক্ত করে দিয়ে সে নিজে অন্য কোনো অচিন দেশে চলে গেছে, যেখানে মানুষকে সাপুড়ে আর সাপকে বিষধর বলে দাগিয়ে দেওয়া হয় না?
মরা নদীর কাদা ঢাকা পায়ের ছাপগুলো নদীর জলে গিয়ে যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকেই তো কত শত নতুন পথের শুরু হতে পারে—যা কোনো মানুষের চোখে কোনোদিন ধরা পড়ে না। 


                                                                                                                        লেখক - আলীম বাবু

No comments:

Post a Comment