Wikipedia
Search results
Pageviews
নিচের follow button টির দ্বারা আপনি এই ওয়েবসাইট টি follow করতে পারেন ।
Sunday, 9 August 2026
Home
/
কিশোর সাহিত্য
/
ভৌতিক গল্প
/
নিশুতির ডাক / 'বাংলা গল্পসল্প' নিবেদিত একখানা ছোট্ট রোমাঞ্চকর ভৌতিক গল্প ।
নিশুতির ডাক / 'বাংলা গল্পসল্প' নিবেদিত একখানা ছোট্ট রোমাঞ্চকর ভৌতিক গল্প ।
পৌষের হাড়-কাঁপা শীত তখন পুরো বর্ধমান শহরটাকে যেন একখানা মস্ত বড় গাঢ় সাদা কুয়াশার চাদরে মুড়ে ফেলেছে। রাত তিনটে বেজে গেছে অনেক আগেই। গোলাপবাগ মোড় থেকে শুরু করে বাবুরবাগের অলিতে গলিতে কোনো ট্রাফিকের শব্দ তো দূরের কথা, একটা কুকুরের ঘেউ-ঘেউ কিংবা রাতের পাহারাদারের লাঠির ঠুকঠাক আওয়াজও পাওয়ার উপায় নেই। জি. টি রোড থেকে শুরু করে খোশবাগানের গলিঘুঁজি—পুরো এলাকাটাই যেন বরফের নিচে নিঝুম হয়ে ঝিমোচ্ছে।
সেই জি. টি রোডের গা-ঘেঁষে থাকা পুরনো একখানা দোতলা বাড়িতে থাকে অপু। অপুর বয়স এই বারো-তেরো, সবে ক্লাস সেভেনে উঠেছে। আর ওর ছায়ার মতো সঙ্গী হলো পাশের বাড়ির পাপাই। দুজনে একই বয়সের, একই ক্লাসের পিঠোপিঠি দুই বন্ধু।
আগের দিন বিকেলবেলা যখন পৌষের মিষ্টি রোদটুকু আমবাগানের মগডালে আবছা হয়ে আসছিল, তখন দুজন মিলে গিয়েছিল শহরের উত্তর মাথার পরিত্যক্ত পীরতলার দিকে। বিশাল পুরনো তেঁতুল গাছ আর তার পাশে ঝাঁকড়া একটা বুনো কুলগাছ। গাছে গাছে টকটকে লাল আর সবুজ মিশেল টোপাকুল যেন থোকা থোকা ঝুলছিল! বিকেল নামলেই পীরতলার ওই দিকটায় একটা থমথমে নীরবতা নেমে আসে। ঠাণ্ডা হাওয়ায় মরা পাতা ঝরে পড়ার শব্দেও বুক কেঁপে ওঠে। কিন্তু কুলের লোভে পাপাইয়ের আর তর সইছিল না। অপুর কানের কাছে মুখ এনে পাপাই ফিসফিস করে বলেছিল, “অপু, কাল একদম ভোররাতে কিন্তু কুল পাড়তে আসতে হবে! আলো ফোটার আগেই। তা না হলে ওই রাজু আর ওর দলবল এসে সব কুল পেড়ে নিয়ে চলে যাবে!”
অপু কুঁকড়ে গিয়ে বলেছিল, “অত ভোরে? ভোরবেলা তো চারদিক অন্ধকার থাকে রে! ঠাকুমা বলে, এই পীরতলা আর আমবাগানের দিকে ওই ভোরে একা বেরোতে নেই...”
পাপাই ভেংচি কেটে বলেছিল, “ধুর! তুই একটা মারাত্মক ভীতুর ডিম! আমি কাল ঠিক তোকে ডাকব। পাঁচটা থেকে সাড়ে পাঁচটার মধ্যে আমি তোর জানালার নিচে এসে টোকা মারব, তুই চুপচাপ দরজা খুলে বেরিয়ে আসবি। কাউকে জাগাবি না কিন্তু!”
রাত তখন পৌনে তিনটে।
বিছানায় শুয়ে দুটো ভারী লেপের ওমেও অপুর হাত-পা কনকন করছিল। বাইরের হিমশীতল হাওয়া জানালার কাঠের ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকে যেন ঘরে সূঁচের মতো ফুটছিল। রাতটা কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকছে। আমবাগানের দিক থেকে আসা হাওয়াটায় আজ কোনো সোঁ-শোঁ শব্দ নেই, বরং মনে হচ্ছে যেন অনেকগুলো অদেখা পা শুকনো পাতায় মড়মড় করে একযোগে হেঁটে বেড়াচ্ছে।
ঠিক রাত তিনটে বেজে পনেরো মিনিটে—অপুর ঘরের খড়খড়ি দেওয়া জানালার নিচে একটা সশব্দ টোকা পড়ল! ঠক... ঠক!
অপুর বুকের ভেতরটা যেন এক লহমায় হিম হয়ে গেল। সে শক্ত হয়ে কান খাড়া করে শুয়ে রইল।
হঠাৎ জানালার ঠিক ওপার থেকে একটা চেনা গলা ফিসফিস করে উঠল—
“অপু... এই অপু... ওঠ না রে!”
আওয়াজটা হুবহু পাপাইয়ের! ওই তো পাপাই যেভাবে দরজার আড়ালে এসে নিচু গলায় ডাকে, ঠিক তেমনই।
অপু বিছানায় ধড়ফড় করে উঠে বসল। নাইট ল্যাম্পের টিমটিমে লাল আলোয় ঘরের দেয়ালঘড়ির দিকে তাকাতেই ওর মাথার ভেতরটা চনমন করে উঠল। ঘড়িতে বাজছে রাত তিনটে পনেরো!
অপু ভাবল, ‘পাপাই এত রাতে এল? কাল তো কথা হয়েছিল ভোর পাঁচটায় আসবে! আর পাপাইয়ের গলাটা এমন জমে যাওয়া বরফের মতো ঠান্ডা শোনাচ্ছে কেন?’
অপু খালি পায়ে বিছানা থেকে নিচে নামল। বরফের মতো ঠান্ডা মেঝেতে পা পড়তেই শরীর কেঁপে উঠল। দরজার কাঠের খিলটার দিকে হাত বাড়াতে গিয়েও অপু হঠাৎ থমকে দাঁড়াল।
ডাকটার ভেতরে কোনো প্রাণের উত্তাপ নেই। শব্দগুলো যেন কোনো মেঝের তলার অন্ধকার গর্ত থেকে ভেসে আসছে—যান্ত্রিক, প্রাণহীন আর খসখসে!
ঠিক তখনই অপুর চোখের সামনে ভেসে উঠল ওর ঠাকুমার মুখটা। গরমকালে যখন লোডশেডিং হতো, উঠোনে মাদুর পেতে বসে ঠাকুমা যেসব গল্প বলতেন—তার মধ্যে একটা ভয়ঙ্কর কথা অপুর হাড়ের মজ্জায় গেঁথে গিয়েছিল।
ঠাকুমা বলতেন—
“শোন দাদু, শীতের নিঝুম রাতে কিংবা অমাবস্যায় বাতাস থেকে জন্ম নেয় ‘নিশুতি’। নিশুতি হলো মানুষ রূপী এক ছায়া-অপচ্ছায়া। ওরা মনের কথা টের পায়। মাঝরাতে তোর সবচেয়ে প্রিয় মানুষের গলার আওয়াজ নকল করে তোকে নাম ধরে ডাকবে। ঠিক তিনবার ডাকবে! তুই যদি একটাও সাড়া দিস বা দরজা খুলিস, ব্যাস! ও তোকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে যাবে নিঝুম বাঁশঝাড়ে কিংবা শ্মশানের দিঘির পারে। তারপর তোকে আর কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যাবে না!”
অপুর গলার ভেতরটা নিমেষে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। কপালে জমে উঠল চটচটে ঠান্ডা ঘাম। পাপাই কি সত্যি এসেছে? নাকি জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই সর্বগ্রাসী নিশুতি?
ঠিক তখনই জানালার কাঠে মুখ ঘষে ভেসে এল দ্বিতীয় ডাকটা—
“অপু... দেরি করছিস কেন বল তো? কুলগাছে কিন্তু রাজুরা পৌঁছে যাবে... বেরো!”
এবার আওয়াজটা শোনামাত্রই অপুর মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত রি-রি করে উঠল! গলাটা পাপাইয়ের হলেও, তার পেছনে যেন শত শত মৃত মানুষের অস্ফুট ফিসফিসানি আর বাতাস কাটার শিস্ ভেসে আসছে।
অপু জানালার খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকানোর চেষ্টা করল। বাইরে জমাট বাঁধা ধোঁয়াটে কুয়াশা ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছিল না, তবে জানালার ঠিক ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল এক মস্ত বড় কালো ছায়ামূর্তি। তার কোনো নির্দিষ্ট হাত-পা বা মুখ নেই, কিন্তু সেখান থেকে বরফের চেয়েও মারাত্মক একটা অতিপ্রাকৃতিক শীতলতা জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকছিল। ঘরের নাইট ল্যাম্পের আলোটাও যেন সেই ছায়ার টানে ফ্যাকাশে হয়ে আসছিল।
অপুর বুকের ভেতরে হাতুড়ি পিটছিল—ঢিপ-ঢিপ! ঢিপ-ঢিপ! ভয়ে ওর হাত-পা পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের মতো অবশ হয়ে এল। চিৎকার করে মা-বাবাকে ডাকবে, সেই ক্ষমতাটুকুও যেন কন্ঠনালী থেকে হারিয়ে গিয়েছিল।
তারপর এল সেই শেষ মুহূর্ত—
বাতাস থমকে গেল। ঘরের কোণে জমে থাকা অন্ধকারটাও যেন জমে বরফ হয়ে গেল। জানালার কাঠে তীব্র নখ আঁচড়ানোর মতো এক বিকট শব্দের সাথে ভেসে এল তৃতীয় ডাক—
“অপু... খোল না দরজাটা... আমি তো দাঁড়িয়ে আছি রে...।”
ডাকটা শেষ হতেই পুরো বাদশাহী রোড এলাকা জুড়ে নেমে এল এক নারকীয় নিস্তব্ধতা!
নিশুতি তিনবারই ডাকে—তার বেশি নয়। কিন্তু এই তিন নম্বর ডাকের পর যে নিস্তব্ধতা নেমে এল, সেটা আগের চেয়ে হাজার গুণ বেশি ভয়ঙ্কর! অপু বুঝতে পারছিল, ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াটা সাড়াশব্দ না পেয়ে তীব্র আক্রোশে জানালার ঠিক ওপারেই ওত পেতে বসে আছে। অপু যদি একটুও নড়াচড়া করে, যদি ভুল করে একটা নিঃশ্বাসের শব্দও ফেলে!
অপু পা টিপে টিপে পিছু হেঁটে বিছানায় গিয়ে উঠল। লেপটা মাথার ওপর টেনে নিয়ে দুই কানে দুই আঙুল চেপে গুঁজে দিল। ভয়ে ওর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল ঝরছিল। ও মনে মনে দেব-দেবী আর ভগবানের নাম জপ করতে লাগল।
রাত তিনটে তিরিশ... তিনটে পঁয়তাল্লিশ... চারটে... চারটে পনেরো...
সময় যেন থমকে গেছে। দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটা অপুর কাছে মনে হচ্ছিল একেকটা চাবুকের আঘাত। অপুর মনে হচ্ছিল, সকাল আর কোনোদিনই হবে না। এই নিঝুম অন্ধকার আর গা হিম করা ঠান্ডা চিরকালের জন্য বর্ধমান শহরকে গিলে খেয়েছে!
পৌনে পাঁচটা নাগাদ বাইরে বাতাসের এক তীব্র গর্জন হলো। ঘরের জানালার পাল্লা দুটো আচমকা সশব্দে কেঁপে উঠল, আর আমবাগানের দিকে বিশাল এক ডানার ঝাপটানোর মতো বিকট সাাঁই-সাাঁই শব্দ ভেসে গিয়ে মিলিয়ে গেল।
তার কিছু পরেই... বহু দূরে কোথাও পীরতলার দিক থেকে ভোরের মোরগ ডেকে উঠল—কুক-কুরু-কূ-ঊ-ঊ!
সেই ডাকটা শোনামাত্রই অপুর মনে হলো ওর বুক থেকে যেন শতমন ওজনের একটা পাথর নেমে গেল। সে আস্তে আস্তে কান থেকে হাত সরাল। লেপ সরিয়ে দেখল—জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের ফ্যাকাশে আলো ঘরে ঢুকছে।
সকাল পৌনে ছয়টায় বাইরের কাঠের গেটে আসল ধাক্কাটা পড়ল।
“অপু! এই অপু! কত ঘুমোবি রে? রোদ উঠে গেল তো! চল, পীরতলায় কুল পাড়তে যাবি না?”
অপুর গায়ের লোম আবার খাড়া হয়ে উঠল! সে দেওয়ালের আড়াল থেকে খুব সাবধানে উঠোনের দিকে তাকাল।
দেখা গেল, চেনা নীল সোয়েটার আর লাল মাফলার জড়িয়ে সত্যি সত্যির পাপাই দাঁড়িয়ে আছে! হাতে ঝুড়ি আর বাঁশের কঞ্চি। মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে পাপাই ঠকঠক করে কাঁপছে।
অপু দৌড়ে নিচে গিয়ে পাপাইয়ের হাতটা চেপে ধরল—হাতটা একদম গরম, রক্ত-মাংসের মানুষের ছোঁয়া!
অপু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “পাপাই! তুই... তুই রাত সাড়ে তিনটের সময় আমাদের জানালার কাছে ডাকতে এসেছিলি?”
পাপাই চোখ গোল গোল করে বলল, “মাথা খারাপ তোর? অত রাতে আমি তো লেপের ভেতর ঘুমোচ্ছি! আমি তো এইমাত্র এলাম!”
অপুর পা দুটো কেঁপে উঠল। সে পাপাইয়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ওর ঘরের জানালার নিচে। ভিজে কাদা-মাটির দিকে তাকাতেই দুজনই থমকে গেল।
সেখানে স্পষ্টভাবে ফুটে রয়েছে মানুষের পায়ের মতো দেখতে, কিন্তু তিনটে দীর্ঘ বাঁকা আঙুলওয়ালা দুটি অলৌকিক পায়ের গভীর ছাপ! ছাপগুলোর চারপাশে জমে থাকা শিশির তখনও বরফের মতো ঠান্ডা।
পাপাই ভয়ে অপুর গায়ে লেপ্টে গিয়ে বলল, “ই-ই-এগুলো কিসের পায়ের ছাপ রে অপু?”
অপু এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছাপগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, “ওটা নিশুতির ডাক ছিল রে পাপাই... কাল রাতে যদি আমি সাড়া দিয়ে দরজাটা খুলতাম, তবে আজকের ভোরটা আর আমার দেখা হতো না। চল, আজ আর পীরতলায় কুল পাড়তে যেতে হবে না... ঘরে চল!”
দুই বন্ধু দ্রুত ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। আর বাইরে, সকালের কুয়াশার আলোয় আমবাগানের হাওয়ায় যেন এক অদ্ভুত, অলৌকিক দীর্ঘশ্বাস ভেসে বেড়াতে লাগল।
লেখক - আলীম বাবু
About বাংলা গল্পসল্প
Templatesyard is a blogger resources site is a provider of high quality blogger template with premium looking layout and robust design. The main mission of templatesyard is to provide the best quality blogger templates.
Related Posts:
ভৌতিক গল্প
Labels: photos
কিশোর সাহিত্য,
ভৌতিক গল্প
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment