Wikipedia
Search results
Pageviews
নিচের follow button টির দ্বারা আপনি এই ওয়েবসাইট টি follow করতে পারেন ।
Friday, 14 August 2026
Home
/
অন্যান্য গল্প
/
ছোটোগল্প
/
ছায়ার সঙ্গে আলো / 'বাংলা গল্পসল্প' নিবেদিত একখানা রোমাঞ্চকর গল্প ।
ছায়ার সঙ্গে আলো / 'বাংলা গল্পসল্প' নিবেদিত একখানা রোমাঞ্চকর গল্প ।
প্রথম পর্ব: নিষ্পাপ শৈশব ও চেতনার প্রথম ফাটল
দিগন্তজোড়া যে ধূসর মাঠটা গ্রামের শেষপ্রান্তে নদী ছুঁয়ে থেমে গেছে, তার নাম ছিল কাঞ্চনডাঙ্গা। শৈশবে সৌরিনের কাছে ওই মাঠটা ছিল অসীম স্বাধীনতার এক রূপক। রোদ পড়লে মাঠের ঘাসগুলো সোনালি আলোয় ঝলমল করত, আর সেই আলো এসে পড়ত সৌরিনের চোখেমুখে। তখন তার বয়স সাত বা আট। চেতনার ক্যানভাসটা তখন একেবারেই সাদা, কোনো আঁচড় পড়েনি তাতে।
সৌরিনের মনে হতো পৃথিবীটা কেবলই আলো দিয়ে তৈরি। সত্য আর মিথ্যার মধ্যে কোনো প্রাচীর ছিল না, ভালো আর মন্দের কোনো পৃথক সংজ্ঞাও তার জানা ছিল না। সে জানত, খিদে পেলে খেতে হয়, আঘাত পেলে কাঁদতে হয়, আর নদীর জলে পা ডুবালে এক অদেখা শীতলতা সমস্ত শরীরকে ভরিয়ে তোলে। এই ছিল তার নিষ্পাপ অস্তিত্ব। কাঞ্চনডাঙ্গা মাঠের ধুলোবালি, কাদা, আর ঝরা পাতার গন্ধেই জড়িয়ে ছিল তার প্রতিদিনের জীবন।
কিন্তু মানুষের নিষ্কলঙ্ক সময় স্থায়ী হয় না। চেতনায় প্রথম ফাটল ধরার জন্য কোনো বিশাল মহাজাগতিক বিপর্যয়ের প্রয়োজন হয় না; ছোট একবিন্দু অন্যায়ের আঘাতই যথেষ্ট।
সৌরিনের বয়স যখন এগারো, তখন প্রথমবার সে আবিষ্কার করল—যে পৃথিবীকে সে আলো দিয়ে তৈরি ভেবেছিল, তার আড়ালে একটা বিরাট অন্ধকার গহ্বর লুকিয়ে আছে। ঘটনাটা ঘটেছিল ইস্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার দিন। দৌড় প্রতিযোগিতায় সৌরিন প্রথম হয়েছিল। জয়মুকুট যখন তার হাতের মুঠোয়, ঠিক তখনই ইস্কুলের প্রভাবশালীদের ছেলে, অর্ক, এসে দাঁড়িয়েছিল শিক্ষকমশায়ের পাশে। একটি মিথ্যা অভিযোগ, একবিন্দু ক্ষমতার প্রভাব, আর মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে গেল দৃশ্যপট। জয়ী হিসেবে ঘোষিত হলো অর্কের নাম।
সৌরিন সেদিন প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর থেকে কোনো শব্দ বের হয়নি। প্রথমবার সে দেখল, সত্য কীভাবে হেরে যায় আর মিথ্যা কীভাবে বিজয়ের হাসি হাসে। সেদিন বাড়ি ফেরার পথে কাঞ্চনডাঙ্গার মাঠের ওপর সন্ধ্যা নেমে আসছিল। সেই গোধূলির আলো-আঁধারিতে সৌরিন প্রথম অনুভব করল, তার বুকের ভেতরে কোথাও একটা সূক্ষ্ম ফাটল ধরেছে। এক অদ্ভুত নীরব বিষাদ তার রক্তে মিশে যেতে শুরু করল।
দ্বিতীয় পর্ব: বয়সন্ধির অন্ধকার ও দ্বৈত সত্তার জন্ম
বয়সন্ধি কেবল শরীরের গঠন পরিবর্তন করে না, তা মানুষের মনকেও এক চরম অস্থিরতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। চৌদ্দ থেকে ষোলো বছরের এই সময়টায় সৌরিনের ভেতরের ফাটলটা গভীর খাদে পরিণত হলো।
বাবার আকস্মিক অসুস্থতা, সংসারে দারিদ্র্যের করুণ থাবা, আর চারপাশের মানুষের নির্মম দৃষ্টিভঙ্গি—সবকিছু মিলে সৌরিনের ভেতরের সেই সহজ-সরল ছেলেটিকে পিষে মারতে লাগল। যে পৃথিবী তাকে আলো দেখাত, সেই পৃথিবীই এখন তাকে প্রতিনিয়ত আঘাত করতে শুরু করল।
ঠিক এই সময়েই, তার চেতনার গভীর অন্ধকার কক্ষ থেকে এক নতুন সত্তার জন্ম হলো। সে সৌরিনেরই ছায়া, কিন্তু সৌরিনের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, যুক্তিপ্রিয় এবং নিষ্ঠুর।
সৌরিন যখন নিজের ঘরে একাকী বসে কাঁদত, তখন তার মনের ভেতরের সেই নতুন কণ্ঠস্বরটি জেগে উঠত। সে বলত, “কেন কাঁদছ সৌরিন? সততা আর দয়া কেবল দুর্বলদের আশ্রয়। এই পৃথিবীটা তো একটা জঙ্গল, আর জঙ্গলে বেঁচে থাকতে হলে তোমাকে শিকারী হতে হবে, শিকার নয়। যে তোমাকে আঘাত করেছে, তাকে ফিরিয়ে দাও দ্বিগুণ আঘাত।”
প্রথম প্রথম সৌরিন ভয় পেত এই স্বগত সংলাপে। সে নিজের বিবেককে আকড়ে ধরে রাখতে চাইত। বলত, “না, অন্যায়ের জবাবে অন্যায় করলে যে আমি আর তাদের মধ্যে কোনো তফাত থাকবে না!”
কিন্তু ছায়াসত্তাটি হেসে উঠত—এক হিমশীতল হাহাসূচক হাসি। সে বলত, “তফাত দিয়ে কী করবে? সম্মান? না রুটি? আজ যে তোমাকে অপমান করল, তার কাছে তোমার ওই নিষ্কলঙ্ক বিবেকের কোনো মূল্য নেই। অন্যায়কে জয় করতে হলে অন্যায়ের ভাষাটাই শিখতে হয়।”
বয়সন্ধির সেই ট্রমা, অবহেলা আর একাকীত্বের দিনে সৌরিনের অজান্তেই তার ভেতরে দুজন মানুষ বসবাস শুরু করল। একজন—যে এখনো পুরনো স্মৃতিকে ভালোবেসে আলো আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়, কিন্তু সে দুর্বল। অন্যজন—যে ক্ষুব্ধ, প্রতিশোধপরায়ণ, ধারালো যুক্তিতে সশস্ত্র এবং অন্ধকারের শক্তি দিয়ে নিজেকে সুরক্ষিত করতে প্রস্তুত।
তৃতীয় পর্ব: দ্বন্দ্বে ভরা জীবন ও পাপের সুতীক্ষ্ণ যুক্তি
বছর কেটে গেল। সৌরিন এখন পঁচিশের এক যুবক। তার চেতনার ক্যানভাসে শৈশবের সেই নিষ্পাপ আলোর ছিটেফোঁটাও আর অবশিষ্ট নেই; বরং সেখানে থমথম করছে এক দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। বাহ্যিকভাবে সৌরিন একজন অত্যন্ত শান্ত, সংযমী এবং নম্র তরুণ। কিন্তু এই শান্ত অবয়বের আড়ালে তার মনের গভীরে প্রতি মুহূর্তে রচিত হচ্ছে দুই পরাশক্তির মল্লযুদ্ধ।
সৌরিনের ভেতরে এখন স্পষ্ট দুটি কণ্ঠস্বর। একটি তার বিবেক, যা নিষ্পাপ শৈশবের করুণ অবশেষ—নাম তার 'আলো'। অন্যটি বয়সন্ধির ক্ষোভ আর অপমান থেকে জন্ম নেওয়া প্রখর যুক্তিবাদী এক অন্ধকারের রূপক—নাম তার 'ছায়া'।
এক দিন সন্ধ্যার মুখে, কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার পথে সৌরিন দেখল, তার বহু পুরোনো এক শত্রু—যে তাকে কৈশোরে অমানবিক অপমানে পিষে মেরেছিল—আজ এক চরম বিপদে পড়েছে। একটা জালিয়াতির মামলায় লোকটির সমস্ত সম্মান ও সম্পত্তি ধ্বংস হওয়ার মুখে। সৌরিনের হাতের মুঠোয় এমন একটি নথিপত্র রয়েছে, যা লোকটিকে এই সর্বনাশের হাত থেকে বাঁচাতে পারে। আবার সে যদি চুপ করে থাকে, তবে লোকটি সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে যাবে।
সৌরিন যখন নিজের ঘরে নির্জনতায় গিয়ে বসল, তখন তার ভেতরের 'ছায়া' হুঙ্কার দিয়ে উঠল।
“এটাই তো সুযোগ সৌরিন!” ছায়াসত্তাটি যেন এক হিমশীতল উল্লাসে চিৎকার করে উঠল, “আজ তোমার প্রতিশোধ নেওয়ার দিন। নথিটা পুড়িয়ে ফেলো। যে লোকটা তোমার শৈশবকে তছনছ করে দিয়েছিল, তাকে ধুলোয় মিশে যেতে দাও। এটাই তো প্রকৃতির বিচার!”
সৌরিনের বুকের ভেতরটা দপ করে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে নথিপত্রটা ছুঁল। তার রক্তে এক অদ্ভুত উগ্রতার উত্তাপ। ঠিক তখনই তার গভীর থেকে ভেসে এল 'আলো'র ক্ষীণ কণ্ঠস্বর—
“না সৌরিন, অন্যকে ধ্বংস করে তুমি কী পাবে? অন্যায়ের উত্তর অন্যায়ে দিলে তোমার আর তার তফাত কোথায় রইল? সে অন্ধকার বেছে নিয়েছিল বলে কি তোমাকেও অন্ধকারের দাস হতে হবে?”
ছায়াসত্তাটি উচ্চস্বরে হেসে উঠল। তার যুক্তি অত্যন্ত ধারালো, একেবারে নিশ্ছিদ্র—
“দুর্বলের মতো কথা বলো না! এই সমাজ দয়া বোঝে না, সে বোঝে কেবল ক্ষমতা। তুমি যদি আজ ওকে ক্ষমা করো, ও তোমাকে মহৎ ভাববে না, ভাববে কাপুরুষ। ক্ষমা কেবল বলবানদের মানায়, আর তুমি যদি আঘাতের বদলে আঘাত না দাও, তবে এই পৃথিবী তোমাকে চিরকাল পিষে মারবে। শোধ নেওয়া কোনো পাপ নয় সৌরিন, ওটা আত্মসম্মান রক্ষা!”
সৌরিন দুই কানের ওপর হাত দিয়ে চেপে ধরল। তার মনে হলো তার মাথার ভেতরে দুটো মহাদেশ ধাক্কা খাচ্ছে। পাপের যুক্তিগুলো এত বেশি আকর্ষণীয়, এত বেশি বাস্তবিক এবং প্রতিশোধের স্বাদে এতই মধুর মনে হচ্ছিল যে সে প্রলোভিত হতে লাগল। সে রাতটা সৌরিনের কাটল অনাহার ও তীব্র অন্তর্দাহে। কোনটা পাপ আর কোনটা পুণ্য, সেই সীমাটি তার চেতনায় পুরোপুরি আবছা হয়ে যেতে লাগল।
চতুর্থ পর্ব: চরম সংকট ও অন্তর্দাহের মোড়
পরের দিন সকালটা এল এক বিষণ্ণ কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে। সৌরিনের ভেতরের দ্বন্দ্বে আর কোনো বিরতি ছিল না; তা এক চরম সংকটে রূপ নিল, যখন তাকে সেই নথিপত্রটি অফিসে জমা দেওয়ার বা ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিতে হলো।
দুপুরের দিকে সে কাঞ্চনডাঙ্গা মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করল—যেখানে বহু বছর আগে তার প্রথম ফাটল ধরেছিল। মাঠের ঘাসগুলো এখন আর সোনালি দেখায় না; শুকনো, রুক্ষ আর ম্লান। বাতাসটাও যেন এক ভারী দীর্ঘশ্বাস বয়ে নিয়ে আসছে।
সে মাঠে একটি পুরোনো অর্জুন গাছের নিচে গিয়ে বসল। পকেট থেকে বের করল সেই নথিপত্রটি।
ছায়াসত্তাটি এবার কেবল ফিসফিস করে বলল না, সে সৌরিনের মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণে এক অদ্ভুত কর্তৃত্ব স্থাপন করল। “জ্বালিয়ে দাও ওটা! এক মুহূর্তের আগুন, আর তোমার বছরের পর বছর ধরে পুষে রাখা ক্ষোভের মুক্তি। তুমি তো ভালো হতে গিয়ে কেবল আঘাতই পেয়েছ, পাওনা পুরস্কার তো পাওনি! তবে কেন আর এই বিবেকের নাটক?”
সৌরিনের হাত থেকে দেশলাইয়ের বাক্সটা বের হয়ে এল। কাঠিটায় বারুদের গন্ধ। সে একটা কাঠি জ্বালল। লালচে আগুনের শিখাটা বাতাসে কাঁপতে লাগল। নথির এক কোণে আগুন ছোঁয়ানোর ঠিক আগের মুহূর্তে সৌরিনের মনে হলো, সে যেন আগুনের মধ্যে নিজের শৈশবের মুখটা দেখতে পাচ্ছে—সেই সাত বছরের নিষ্পাপ সৌরিন, যে নদীর জলে পা ডুবিয়ে অদেখা শীতলতা অনুভব করত।
হঠাৎ তার ভেতরে এক তীব্র বিস্ফোরণ ঘটল। সে বুঝতে পারল, সে যদি আজ আগুন জ্বালিয়ে লোকটিকে ধ্বংস করে, তবে সে কেবল লোকটিকে ধ্বংস করবে না—সে তার ভেতরের শেষ আলোটুকুকেও চিরতরে ছাই করে দেবে।
“তুমি জিততে চাও ছায়া,” সৌরিন নিজের ভেতরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে চেঁচিয়ে উঠল, “কিন্তু এই জয় তো আমাকে মুক্তি দেবে না, আমাকে তোমার গোলাম বানিয়ে দেবে!”
ছায়াসত্তাটি হুঙ্কার দিয়ে উঠল, “তাহলে কি তুমি হার স্বীকার করবে? তুমি কি আবারও সেই বলির পাঁঠা হতে চাও?”
“না!” সৌরিনের কণ্ঠস্বর এবার প্রকম্পিত হয়ে উঠল, “আমি আর কারও হাত থেকে আঘাত পেয়ে বলির পাঁঠাও হব না, আবার অন্ধকারের কাছে নিজের আত্মা বেচে দিয়ে শিকারীও হব না। আমি এই দুটোর মাঝখানের হিসাবটা মিলাব!”
সৌরিন হাত বাড়িয়ে দেশলাইয়ের কাঠিটা ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল। ধোঁয়ার একটা নীল কুণ্ডলী বাতাসে মিলিয়ে গেল। কিন্তু সংকট শেষ হলো না, কারণ সে জানত—কেবল ক্ষমা করলেই সমস্যার সমাধান হয় না, আবার কেবল ধ্বংস করলেও আত্মা বাঁচে না। তাকে এবার নিজের আদালতের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।
পঞ্চম পর্ব: মনস্তাত্ত্বিক আদালত ও নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হিসাব
সেই বিকেলে সৌরিন আর বাড়ি ফিরল না। কাঞ্চনডাঙ্গা মাঠের এক প্রান্তে পরিত্যক্ত, জরাজীর্ণ এক পুরোনো ডেক বাক্সের ওপর সে গিয়ে বসল। চারপাশটা নিঃশব্দ, কেবল দূর থেকে ভেসে আসছে রাতের পাখির ডাক। এই নির্জনতা ছিল সৌরিনের নিজের ভেতরের এক আদালত। কোনো বিচারক নেই, কোনো আসামি নেই—আসামি ও বিচারক সে নিজেই।
সে পকেট থেকে নথিটা বের করে সামনে রাখল। অন্ধকার ঘনিয়ে আসতেই তার মনস্তাত্ত্বিক ফাটলটা এক সুবিশাল আয়নার মতো তার সামনে ভেসে উঠল।
ছায়াসত্তাটি এক তীব্র বিদ্রূপের হাসি হেসে সামনে এসে দাঁড়াল। “তুমি আগুন নেভালে সৌরিন, কিন্তু নিজেকে কি বাঁচাতে পারবে? ভেবেছ নথিটা ফিরিয়ে দিলে তুমি ধোয়া তুলসী পাতা হয়ে যাবে? তোমার মনের ভেতরে যে ক্ষোভ, যে কুৎসিত হিংসা আর অন্ধকারের লোভ লুকিয়ে আছে—তা কি তুমি মুছে ফেলতে পারবে?”
এবার সৌরিন চোখ বুজল না, পালিয়েও গেল না। সে সরাসরি তার ছায়াসত্তার চোখের দিকে তাকাল।
“আমি তা মুছতে চাই না, ছায়া,” সৌরিনের গলার স্বর এবার স্থির, শান্ত।
ছায়াসত্তাটি কিছুটা থমকে গেল। “তার মানে? তুমি আমাকে অস্বীকার করছ না?”
“না,” সৌরিন বলল, “বহু বছর ধরে আমি ভেবেছি তুমি আমার শত্রু। ভেবেছি তুমি এক পাপ, যাকে দমন করতে হবে, মুছে ফেলতে হবে। কিন্তু আজ আমি বুঝতে পারছি, তুমি কোথা থেকে এসেছ। তুমি এসেছ আমার ক্ষত থেকে, আমার অবহেলা থেকে, আমার অন্যায়ের বিরুদ্ধে না বলতে পারার অক্ষমতা থেকে। তুমি আমারই এক প্রতিরক্ষাবলয়। সমাজ যখন আমাকে আঘাত করেছিল, তুমি আমাকে বাঁচানোর জন্য নিষ্ঠুরতার বর্ম পরাতে চেয়েছিলে।”
ছায়াসত্তাটির সেই ধারালো যুক্তির ধার যেন হঠাৎ থমে গেল। সে তড়পে উঠে বলল, “তাহলে ক্ষমা করছ না কেন আমাকে? কেন বেছে নিচ্ছ না আমাকে পুরোপুরি?”
“কারণ তোমার পথটা এক অন্ধ গহ্বর,” সৌরিন জবাব দিল। “তুমি আঘাতের বদলে আঘাত দিতে চাও, কিন্তু তাতে চক্রটা থামে না। আমি যদি আজ আমার শত্রুকে ধ্বংস করি, তবে আমি তোমার গোলাম হব। আর যদি আমি অন্ধের মতো ক্ষমা করে নিজেকে আবার বলি দিই, তবে আমি বিবেকের ভণ্ডুল হব। আমি কোনোটাই হব না।”
সৌরিন নথিটি হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে স্থির করল, নথিটি সে গোপনও করবে না, আবার শত্রুকে ধ্বংস করার জন্য অন্যায়ভাবে ব্যবহারও করবে না। সে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবে। লোকটিকে সে নথিটি ফিরিয়ে দেবে, কিন্তু স্পষ্ট করে জানিয়ে দেবে—এই দয়া বা ক্ষমা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটা তার নিজস্ব পছন্দের জয়। সে অন্যায়ের শোধ অন্যায়ে দেবে না, কারণ সে নিজের আত্মার ওপর কোনো অন্ধকারের দাগ বসাতে রাজি নয়।
সেই রাতে সৌরিন প্রথমবারের মতো বুঝতে পারল—আলো আর অন্ধকার দুটোই তার অংশ। অন্ধকারকে অস্বীকার করার নাম পুণ্য নয়, বরং অন্ধকারকে চিনে নিয়ে তাকে আলোর নিয়ন্ত্রণে রাখাই আসল মনুষ্যত্ব।
ষষ্ঠ পর্ব: পুনরুত্থান ও ছায়াকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটা
ভোর চারটে। কাঞ্চনডাঙ্গা মাঠের ওপর দিয়ে এক হালকা মিঠে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। পুবের আকাশে কালচে নীল রঙটা ধীরে ধীরে রক্তিম আভায় বদলে যেতে শুরু করেছে। গোধূলির পর যেমন রাত আসে, রাতের পর তেমনই আসে এক নতুন সকাল—প্রকৃতির এই চিরন্তন নিয়মটাই যেন সৌরিনের জীবনের ওপর সত্য হয়ে ফুটে উঠল।
সৌরিন হাঁটা শুরু করল। তার হাঁটার ভঙ্গিতে আর সেই পুরোনো দ্বিধা বা মানসিক ভার নেই। তার বুকের ভেতরটা আজ ভারী মুক্ত, যেন এক দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে এক পরম শান্তি নেমে এসেছে।
তার ভেতরের ছায়াসত্তাটি গায়েব হয়ে যায়নি, সে এখনো আছে। কিন্তু সে আর রক্তচক্ষু নিয়ে হুঙ্কার দিচ্ছে না, সৌরিনের ঘাড়ে চেপে বসে সিদ্ধান্ত নিচ্ছ না। সে এখন সৌরিনেরই এক শান্ত, অনুগত ছায়া হয়ে তার পাশে হাঁটছে। সেই ছায়া সৌরিনকে মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীটা সব সময় সহজ নয়, তাই তাকে সচেতন থাকতে হবে; কিন্তু সে আর সৌরিনকে অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে না।
আর তার ভেতরের 'আলো'? সে আর দুর্বল, নিঃসঙ্গ কোনো কান্নার আওয়াজ নয়। অন্ধকারকে সামনাসামনি দেখে এবং তাকে চিনে নেওয়ার পর সেই আলো এখন এক পরিণত, বিচক্ষণ আলোয় রূপান্তরিত হয়েছে।
সৌরিন কাঞ্চনডাঙ্গা মাঠ পার হয়ে নদীর ঘাটে এসে দাঁড়াল। নদীর জল ভোরের প্রথম আলোয় ঝিলমিল করে উঠছে। বহু বছর পর সৌরিন আবার সেই জলের দিকে তাকাল। তার মনে পড়ে গেল সাত বছরের সেই নিষ্পাপ সৌরিনকে, যে একদিন ভাবত পৃথিবীটা কেবল আলো দিয়ে তৈরি।
আজ পঁচিশ বছর বয়সে এসে সে জানে, পৃথিবী কেবল আলো দিয়ে তৈরি নয়, তাতে অন্ধকারও আছে। কিন্তু মানুষের জন্মই হয় সেই অন্ধকারকে চিনে নিয়ে আলোর দিকে উত্তরণ ঘটানোর জন্য।
সে পকেট থেকে নথিটা বের করে নিজের ব্যাগে সযত্নে রাখল। আজ সকালে সে লোকটির মুখোমুখি হবে। তাকে বাঁচাবে, কিন্তু নিজের শর্তে—বিবেকের শর্তে।
নদীর জলের দিকে তাকিয়ে সৌরিন এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জলের বুকে তার ছায়া পড়েছে। রোদ যতো বাড়ছে, ছায়া তত স্পষ্ট হচ্ছে, কিন্তু আলোর তেজও ততটাই বাড়ছে। সৌরিন হাসল। সে আর নিজের ছায়াকে ভয় পায় না, ছায়াকে মুছে ফেলতেও চায় না।
সে তার অতীত, তার পাপ, তার পুণ্য, তার সমস্ত ভুল আর আঘাতকে নিজের অস্তিত্বের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। এটাই তার পুনরুত্থান। সে দেবতাও হয়নি, শয়তানও হয়নি—সে এক সম্পূর্ণ, সচেতন মানুষ হয়ে নতুন ভোরের আলোয় পা বাড়াল।
(সমাপ্ত)
লেখক - আলিম বাবু
About বাংলা গল্পসল্প
Templatesyard is a blogger resources site is a provider of high quality blogger template with premium looking layout and robust design. The main mission of templatesyard is to provide the best quality blogger templates.
Related Posts:
ছোটোগল্প
Labels: photos
অন্যান্য গল্প,
ছোটোগল্প
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment