Wikipedia
Search results
Pageviews
নিচের FOLLOW BUTTON টির দ্বারা আপনি ওয়েবসাইটটি FOLLOW করতে পারেন।
Monday, 24 August 2026
নিশুতি রাতের রক্তচক্ষু / 'বাংলা গল্পসল্প' নিবেদিত একখানা রোমাঞ্চকর ভৌতিক গল্প ।
(১)
কাঁচাতলা গ্রামটির গা ঘেষে চলে গেছে একদা প্রবহমান, অধুনা মন্থর এক নদী—কপিলধারা। শহরের কৃত্রিম কোলাহল কিংবা ধাতব রাজপথের হিংস্র গর্জন এই জনপদের সীমানা স্পর্শ করতে পারে না। মেঠো পথ, প্রাচীন অশ্বত্থ আর শ্যাওলাধরা আম-কাঁঠালের ঘন বাগানের আড়ালে গ্রামটি যেন এক চিরন্তন ঘুমের ভেতর তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে থাকে।
গ্রামের একেবারে দক্ষিণ সীমানায়, যেখানে ভিটে শেষ হয়ে শুরু হয়েছে দিগন্তবিস্তারী প্রান্তর আর অন্ধকার বাঁশঝাড়, সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে নীলিমাদের পারিবারিক পুরোনো দালানবাড়িটি। চুন-সুরকি, গাঢ় লাল ইট আর প্রাচীন অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গঠিত একতলা সুবিশাল বাড়ি। বাড়িময় পুরোনো দিনের এক স্নিগ্ধ গন্ধ জড়িয়ে থাকে—ভিজে স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল, লম্বা কাঠের কড়ি-বরগার ছাদ আর ঘরে ঘরে জমিয়ে রাখা দীর্ঘ অতীত স্মৃতি।
অন্যান্য দিনে এই বাড়িটা এক আনন্দমুখর নীড়। নীলিমার পিতামহের জীর্ণ কাশির আওয়াজ, পিসিদের খুনসুটি, গৃহকর্মে ব্যস্ত মাতার চুড়ির শিঞ্জন আর কনিষ্ঠ ভ্রাতার কলকাকলিতে গৃহটি সর্বদাই গমগম করে। নীলিমা—সদ্য স্নাতক পেরোনো এক বুদ্ধিমতী, ছিপছিপে গড়নের যুবতী। তার চোখের গভীরে এক অদ্ভুত শান্ত গভীরতা আছে, যা মানুষকে মুগ্ধ করে। কিন্তু আজকের এই বিশেষ রাতটি অন্য সমস্ত চেনা রাতের চেয়ে আলাদা, চরম এক একাকীত্বের আশঙ্কায় মোড়া।
বিকেলের দিকে সংবাদ এলো পাশের শহর থেকে। শহরের হাসপাতালে নীলিমার বড় পিসি হঠাৎ মুমূর্ষু হয়ে পড়েছেন। বার্তা পাওয়ামাত্রই পরিবারের সকলকে তড়িঘড়ি রওনা হতে হলো। পিসির অবস্থা সংকটজনক, তাই রাত্রি পার করে পরদিনের রোদ ওঠার পূর্বে কারও ফেরবার জো নেই।
জনমানবহীন রেখে এত বড় বাড়ি ছেড়ে যাওয়া নিরাপত্তার খাতিরে অনুচিত। অধিকন্তু পরিবারের বৃদ্ধ, বিশ্বস্ত জার্মান শেপার্ড কুকুর 'ভৈরব'কে একা ফেলে যাওয়া অসম্ভব। তাই নীলিমা নিজেই জেদ ধরে থেকে গেল।
"তুই একা থাকতে পারবি তো রে নীলু?"—কোঁচড় থেকে চাবির গোছাটা বের করতে করতে মা উদ্বিগ্ন ও দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে শুধিয়েছিলেন।
নীলিমা মৃদু হেসে আশ্বস্ত করে বলেছিল, "মা, এই বাড়ি আমাদের চার পুরুষের ভিটে। এর প্রতিটা ইট-কাঠ আমার চেনা। এখানে ভয় কিসের? ভৈরব তো রইল আমার সঙ্গে। তোমরা দ্বিধাহীন চিত্রে যাও।"
সন্ধ্যা পেরিয়ে নিবিড় আঁধার যখন চারপাশের চরাচরে তার কালো ডানা মেলতে শুরু করল, নীলিমা প্রবেশদ্বারের সুবিশাল অর্গল দুটি তুলে দিল। একে একে সমস্ত জানালার কবাট শক্ত করে এঁটে দিল সে।
শ্রাবণের মেঘে আকাশ কুচকুচে কৃষ্ণাঙ্গ রূপ ধারণ করেছে। ঝুম বৃষ্টি নেই, কিন্তু দমকা বাতাসের একটানা সোঁ সোঁ আর্তনাদে অশ্বত্থ ও বাঁশঝাড়ের লতাগুল্ম ছাদের টিনের চালে অবিরত আছড়ে পড়ছে। সে যেন কোনো অদেখা শিল্পীর বাজানো বিষাদময় ও অমঙ্গলসূচক সুর।
হ্যারিকেন হাতে নিয়ে নীলিমা ভিতরের প্রকোষ্ঠে এলো। ভৈরব সাধারণত সন্ধ্যার পর নিরবচ্ছিন্ন নিদ্রায় মগ্ন থাকে। কিন্তু আজ সে পিতামহের ঘরের কোণে কুঁকড়ে শুয়ে আছে। তার দুটি রক্তাভ চোখ স্থির হয়ে আছে কাঠের বন্ধ জানালার কবাটে। সে কোনো ঘেউ ঘেউ গর্জন করছে না, কিন্তু তার গলার গভীর থেকে নির্গত হচ্ছে এক অদ্ভূত, করুণ ও ঘড়ঘড়ে সুর—যা গৃহের আবহকে আরও ভারী করে তুলছে।
নীলিমা ভৈরবের সমীপবর্তী হয়ে পরম মমতায় তার মাথায় হাত বুলাতে গেল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, পশুপাখির সাহচর্যে লালিত এই বাধ্য প্রাণীটি নীলিমার ছোঁয়া পেয়েই শিহরিত হয়ে উঠল এবং একলাফে খাটের তলার গভীর আঁধারে মুখ লুকাল।
নীলিমার বুকের ঠিক মধ্যস্থলে যেন এক অদৃশ্য তাসের ঘর ভেঙে পড়ল। একটি বিশ্বস্ত প্রাণীর এই অহেতুক ও গূঢ় আতঙ্ক নীলিমার মনের গহীনে প্রচ্ছন্ন এক সন্দেহের বীজ রোপণ করে দিল। সুবিশাল জনশূন্য গৃহের এই নিস্তব্ধতা যেন একমুহূর্তেই কোনো ভারাক্রান্ত পাষাণের মতো নেমে এলো।
(২)
রাত্রি তখন প্রথমাংশ পেরিয়ে মধ্যরাতের কাছাকাছি। আনুমানিক এগারোটার ঘণ্টা বেজে গেছে।
নীলিমা তার শয়নকক্ষের কাঠের শয্যায় শুয়ে একখানা ধ্রুপদী উপন্যাস পাঠের বৃথা চেষ্টা করছিল। কিন্তু কোনো বাক্যই তার মস্তিষ্কে প্রবেশ করছিল না। দেওয়ালঘড়ির লম্বকের প্রতিটি দোলনের শব্দ—টিক... টিক... টিক...—হঠাৎ অত্যন্ত উচ্চকিত ও হিংস্র মনে হতে লাগল। যেন ঘরে কোনো জীবন্ত সত্তা নেই, কেবল ওই পাষাণ ঘড়িটিই এক অশুভ ক্ষণ গণনার দায়িত্ব পালন করছে।
সে রেডিওর টিউনিং নবটি ঘুরিয়ে সুর সন্ধানের চেষ্টা করল। কিন্তু স্পিকার ভেদ করে কোনো সংগীত ভেসে এলো না; ভেসে এলো কেবল এক বুক-কাঁপানো যান্ত্রিক ঘড়ঘড়ানি ও হিসহিস শব্দ—যেন সুদূর কোনো অচেনা ছায়াপথ থেকে কোনো অজানা সত্তা অমঙ্গলের বার বার্তা পাঠাচ্ছে।
বিরক্ত ও অজানা শঙ্কায় সে যন্ত্রটি স্তব্ধ করে দিল।
ঘরের কোণে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা হ্যারিকেনের পীতবর্ণ আলোয় সে লক্ষ্য করল, চতুর্দিকের দেওয়ালে যে ছায়াসমূহ অঙ্কিত হয়েছে, তারা স্থির নয়। বাতাসের কোনো কাঁপন ছাড়াই সেই কৃষ্ণবর্ণ ছায়ারা যেন সজীব হয়ে উঠেছে, আড়মোড়া ভাঙছে, অদ্ভুতভাবে দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
ঠিক তখনই শব্দটির প্রথম উৎপত্তি ঘটল।
খস... খস... খস...
উঠোনের শুষ্ক আমপাতা আর মরা বাঁশপাতার ওপর ভারী কিছু একটা ঘষে ঘষে টেনে নিয়ে যাওয়ার শব্দ।
নীলিমা একঝটকায় বিছানায় সোজা হয়ে বসল। তার বুকের ভেতরটা যেন কালবৈশাখী ঝড়ের দুলুনির মতো আছাড় খেতে লাগল। সে সমস্ত চেতনা কান দুটিতে কেন্দ্রীভূত করল।
শব্দটির মধ্যে এক অদ্ভুত ও অস্বাভাবিক ছন্দ রয়েছে। যদি কোনো চোর বা দুষ্কৃতকারী পদবিক্ষেপ করে, তবে তার খালি পা কিংবা জুতোর এক নির্দিষ্ট ওজন থাকে। যদি বনজ কোনো শৃগাল, মার্জার কিংবা মেছোবিড়াল চলাচল করে, তবে তার চটপটে ও লঘুপায়ের স্পর্শ পাওয়া যায়।
কিন্তু এই শব্দে কোনো পদশব্দের লেশমাত্র নেই! মনে হচ্ছে যেন এক বিশাল, বিপুল ও নমনীয় কোনো ভারী আস্তরণ, কোনো প্রাচীন রূপহীন মাংসপিণ্ড ধীরগতিতে মাটির বুক চিরে নিজেকে হিঁচড়ে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে আসছে।
খস... মচ... খস...
শব্দটি পিছনের কাঁচা বারান্দা অতিক্রম করে এবার নীলিমার শয়নকক্ষের ঠিক কাঠের জানালার সোজাসুজি নিচে এসে থমকে গেল!
এক লহমায় পুরো কক্ষের আবহাওয়া পরিবর্তিত হয়ে গেল। আগস্টের ভ্যাপসা আর্দ্র গরমের রাতে হঠাৎ যেন কোনো মেরু অঞ্চলের হিমশীতল বাতাস ঘরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল। নীলিমার গায়ের রোমকূপ খাড়া হয়ে উঠল। ললাটে ও গ্রীবায় জমে উঠল শীতল ঘামেরবিন্দু।
হ্যারিকেনের লালচে সলতেটি তীব্রভাবে কেঁপে উঠে নীল বর্ণ ধারণ করল, এবং অচেনা এক বাতাসের ঝাঁপটায় এক লহমায় নিভে গেল!
পুরো ঘর তলিয়ে গেল নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের অতলে। নীলিমার মনে হলো, জানালার ওপারেই ঠিক কয়েক ইঞ্চি দূরত্বে কিছু একটা নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে... যা নীলিমার ফুসফুসের প্রতিটা নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে, আর উপভোগ করছে তার জমাটবাঁধা মানসিক যন্ত্রণা।
(৩)
নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে জমে গিয়ে নীলিমা নিজের শয্যায় বসে রইল। তার তারা দুটি অন্ধকারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু আদিম ভয় তার দৃষ্টিভঙ্গিকে আচ্ছন্ন ও ঘোলাটে করে দিচ্ছে।
এই মুহূর্তে নীলিমার চেতনা দুটি তীব্র মেরুতে বিভক্ত হয়ে গেল। তার আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মন যুক্তি সাজিয়ে বলল—
'এটা নিশ্চিতরূপে কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা। হয়তো বনাঞ্চল থেকে কোনো বিষাক্ত সরীসৃপ কিংবা আঘাতপ্রাপ্ত চিতা বাঘ লোকালয়ে চলে এসেছে। বনাঞ্চল ঘেরা কাঁচাতলা গ্রামে এমনটা বিচিত্র নয়। ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই, সেগুনকাঠের কবাট ও প্রাচীর যথেষ্ট মজবুত।'
কিন্তু তার চেতনার গভীর স্তরে লীন হয়ে থাকা অন্য আরেকটা অংশ, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবজাতি বংশানুক্রমে রক্তে বহন করে আসছে—সেই আদিম সংস্কার চিৎকার করে বলে উঠল—
'না! কোনো স্বাভাবিক পশুর উপস্থিতি এতখানি বরফ-শীতল নীরবতা সৃষ্টি করতে পারে না! কোনো সাধারণ প্রাণীর ছায়ায় হ্যারিকেনের শিখা নীল হয়ে নিভে যায় না! ভৈরব কেন আতঙ্কে খাটের নিচে কুঁকড়ে থাকবে? বাইরে যা অবস্থান করছে, তা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে!'
এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে নীলিমার মস্তিষ্ক যেন অবশ হয়ে যাচ্ছিল। সে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত যুবতী, অলৌকিক কোনো সত্তায় তার বিশ্বাস নেই। কিন্তু আজকের এই নিস্তব্ধ রাত, এই চরম নিঃসঙ্গতা তার সমস্ত যুক্তিকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।
বাইরের সেই অদেখা সত্তাটি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে কোনো ত্বরান্বিত ভাব দেখাচ্ছে না। তার সেই গভীর নিস্তব্ধতার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে এক পরম অহংকার ও হিংস্রতা।
নীলিমা আর ব্যাকুলতা সহ্য করতে পারল না। সত্যের মুখোমুখি তাকে হতেই হবে। বাইরে কি কোনো বুনো পশু, নাকি মানুষের কোনো কুৎসিত চক্রান্ত, নাকি সত্যিই এমন কিছু যা ভাষার অতীত?
সে অত্যন্ত সতর্কতায়, মেঝের ওপর বিন্দুমাত্র শব্দ না করে খাট থেকে নামল। তার খালি পা দুটি মেঝের ওপর বরফের মতো ঠেকছিল। সে ধীরপদে, প্রতিটি পদক্ষেপে চরম সংযম বজায় রেখে জানালার দিকে অগ্রসর হলো।
তাদের ঘরের জানালাগুলো বহুকালের সেগুনকাঠ দিয়ে নির্মিত। দুটি কবাট যেখানে এসে মেলে, সেখানে সুদীর্ঘ ব্যবহারের ফলে কাঠের কিছুটা অংশ ক্ষয়ে গিয়ে একটি সামান্য ফাঁক তৈরি হয়েছিল—যার প্রস্থ এক সেন্টিমিটারের বেশি নয়।
নীলিমা দুই হস্ত দিয়ে নিজের ব্যাকুল বুকের খাঁচা চেপে ধরল, যাতে নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দ বাইরে না ছড়ায়। তারপর পরম ধীরতায়, জানালার সেই সামান্য ফাঁকটিতে নিজের ডান চোখটি রাখল।
বাইরে নিছিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ অন্ধকার। কিন্তু জানালার ঠিক ওপারে, মাটি থেকে আনুমানিক তিন ফুট উঁচুতে ভেসে রয়েছে—দুটো সুবিশাল, ডিম্বাকৃতি রক্ত-লাল চোখ!
নীলিমা মুহূর্তের জন্য চোখ বুজে ফেলল। ভাবল, এটা নিশ্চয়ই তার উন্মাদ মস্তিষ্কের হ্যালুসিনেশন! সে আবার চোখ খুলল এবং সেই ফাঁকে দৃষ্টি স্থাপন করল।
না! কোনো ভুল নেই!
অন্ধকারের সেই কালিমার মধ্যে অঙ্গারের মতো দাউদাউ করে জ্বলছে দুটি চোখ। সে চোখে কোনো পলক পড়ছে না। নেই কোনো মণি বা চোখের সাদা অংশ। কেবল এক গভীর, বিভৎস, আভা ছড়ানো লাল আলো।
কিন্তু যে দৃশ্যটি নীলিমার আত্মাকে চরম আতঙ্কের অতলে তলিয়ে দিল, তা হলো—সেই দুটি রক্তচক্ষু ছাড়া বাইরে আর কোনো অবয়ব নেই!
নীলিমা তার দৃষ্টিকে প্রসারিত করে দেখার চেষ্টা করল। যদি ওটা কোনো চিতা বা বাঘ হতো, তবে জ্বলন্ত চোখের পেছনে অন্ধকারের সিলুয়েটে তার মস্তক, কানে ঢাকা মুখমণ্ডল বা শারীরিক অবয়ব কিছুটা হলেও অনুমিত হতো। যদি ওটা কোনো মানুষ হতো, তবে তার ছায়ামূর্তি দেখা যেত।
কিন্তু সেখানে কোনো মস্তক নেই! কোনো মুখমণ্ডল নেই! কোনো হাত, পা, কঙ্কাল বা মাংসপিণ্ডের শরীর নেই!
এমনকি অন্ধকারের বুকে যে প্রচ্ছায়া পড়ে, সেই ছায়াও সেখানে অনুপস্থিত! কেবল আদিম এক অন্ধকারের শূন্যতায় কুচকুচে কালিমার বুক চিরে ভেসে রয়েছে দুটি রূপহীন জোড়া চোখ!
যেন পুরো অমাবস্যার অন্ধকারটাই কোনো এক অশুভ চেতনায় রূপ নিয়েছে, আর তার প্রকাশের মাধ্যম কেবল এই দুটি জ্বলন্ত চোখ!
আরও বেশি ভয়ানক বিষয় হলো, সেই জোড়া চোখের দৃষ্টি ঠিক জানালার সেই ফাঁকটার দিকেই নিবদ্ধ! ওটা জানালার এই কাষ্ঠনির্মিত প্রাচীর ভেদ করেও ভেতরে নীলিমার উপস্থিতি অনুভব করতে পারছে। ওটা স্পষ্ট জানে, জানালার ওপারে এক রক্ত-মাংসের যুবতী ভয়ে থরথর করে কাঁপছে!
নীলিমা আর সহ্য করতে পারল না। সে একপা পিছিয়ে এল। তার চিৎকার করে উঠবার ইচ্ছা হলো, কিন্তু ভয়ের তীব্রতায় তার কণ্ঠনালী রুদ্ধ হয়ে গেল।
(৪)
নীলিমা পিছলে গিয়ে কক্ষের মাঝখানের মেঝের ওপর বসে পড়ল।
বাহিরের সেই অবয়বহীন সত্তা যেন টের পেল নীলিমার এই চরম অসহায়তা। এবার জানালার কাঠের ওপর ভেসে এলো এক সূক্ষ্ম আঁচড়ের শব্দ।
ক্যাঁচ... ক্যাঁচ...
মনে হচ্ছে কোনো অদৃশ্য তীক্ষ্ণ নখ কাষ্ঠপিণ্ডের গায়ে ধীরে ধীরে আঁচড় কাটছে। শব্দটা জোরালো নয়, কিন্তু তা সরাসরি নীলিমার স্নায়ুর ওপর এসে আঘাত করছে।
নীলিমা অনুভব করল, এই সেগুনকাঠের কবাট কিংবা অর্গল ওই অলৌকিক সত্তার সামনে কোনো প্রতিরোধই নয়। ওটা চাইলে এখনই এই ঘর চুরমার করে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু ওটা তা করছে না। ওটা যেন নীলিমার ভীতিকে মদের মতো উপাদেয় ভেবে পান করছে। এটি এক মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন!
নীলিমা মেঝের ওপর হাঁটু মুড়ে বসল। দু হাত জোড় করে সে চোখ দুটি শক্ত করে বুজল। তার বিজ্ঞানমনস্কতা, তার আধুনিক শিক্ষা—সব ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এখন তার একমাত্র আশ্রয় পরম কোনো অদৃশ্য শক্তি।
সে ফিসফিস করে কাঁপা গলায় প্রার্থনা করতে লাগল—
"হে প্রভু... রক্ষা করো। এই রাতের অন্ধকার বিনষ্ট করো... সূর্যকে উদিত করো আলো নিয়ে..."
সে মনে মনে পরমেশ্বরের নাম জপ করতে লাগল।
বাইরে আবার শুরু হলো সেই হিঁচড়ে চলার শব্দ। খস... খস...
সেই জোড়া লাল চোখ যেন জানালার এপাশ থেকে ওপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগল। মাঝে মাঝে জানালার কাঠে এক শীতল চাপ এসে পড়তে লাগল, যার দরুন পুরো ঘরের তাপমাত্রা আরও নিচে নেমে যাচ্ছিল। নীলিমার ওষ্ঠদ্বয় ঠাণ্ডায় ও ভয়ে নীল রূপ ধারণ করল।
সময় যেন থমকে গেছে। এক একটি প্রহর নীলিমার কাছে একেকটা যুগের মতো দীর্ঘ মনে হতে লাগল। ঘড়ির কাঁটা কি সত্যি অগ্রসর হচ্ছে? নাকি এই অমাবস্যা আর কোনোদিন শেষ হবে না? কাঁচাতলা গ্রাম কি আজ রাতের জন্য চিরতরে মহাবিশ্বের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে?
নীলিমা আর চোখ খুলল না। সে জানে, সে যদি আবার জানালার ফাঁকে চোখ রাখে এবং সেই অদেখা জোড়া রক্তচক্ষুর মুখোমুখি হয়, তবে তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে যাবে। সে তার সমস্ত আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তিকে এক জায়গায় এনে একটানা জপ করে গেল।
ভয়ের চরম শিখরে পৌঁছে মানুষের মন যেমন অসাড় হয়ে যায়, নীলিমার অবস্থাও তেমনই হলো। অশ্রু শুকিয়ে গেছে, শরীর অবশ, কেবল ওষ্ঠদ্বয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নড়ছে—ভোরের আলোর আকুল প্রার্থনায়।
(৫)
রাত্রি কত হলো? তিনটা? চারটা?
হঠাৎ করে, সুদূর কোনো এক প্রান্তর থেকে—গাঁয়ের কোনো গৃহস্থ বাড়ির খামার থেকে এক মোরগের স্পষ্ট ডাক ভেসে এলো।
কুক-কুরু-কূ...
সেই প্রাতঃকালীন ডাকটি যেন অন্ধকারের সেই অতিপ্রাকৃতিক মায়াজালকে এক নিমেষে ছিন্নভিন্ন করে দিল!
সাথে সাথে ঘরের সেই বরফ-শীতল আবহাওয়া বিদায় নিতে শুরু করল। হ্যারিকেনের পোড়া সলতের গন্ধটা আবার নাসিকারন্ধ্রে প্রবেশ করল। বাইরে থেকে ভেসে এলো একটি শেষ দীর্ঘ খসখসে শব্দ—খসসস...
শব্দটি পেছনের ঘন বাঁশঝাড়ের দিকে দ্রুত পিছিয়ে যেতে লাগল, যেন আলোর আবির্ভাবে সেই অন্ধকারের সত্তা পালিয়ে বাঁচতে চাইছে।
নীলিমার শ্রান্ত শরীর আর এই চরম মানসিক পেষণ সহ্য করতে পারল না। তার চোখের সামনে সমস্ত কিছু ঘনীভূত হতে শুরু করল। মস্তিষ্কে ভয়ের চরম ক্লান্তিতে সে মেঝের ওপরই সংজ্ঞাহীন হয়ে ঢলে পড়ল।
যখন নীলিমার চেতনা ফিরে এলো, তখন জানালার ফাঁক গলে সোনাঝরা নরম রোদ তার মুখের ওপর এসে পড়েছে। বাইরে পাখিদের কূজন, দূর থেকে ভেসে আসা কৃষকদের কলরোল—সব মিলিয়ে এক জীবনমুখর সকাল।
একই সাথে দেউড়ির দরজায় তীব্র করাঘাতের শব্দ—"নীলিমা! ও নীলু! দরজা খোল রে বাপি! আমরা এসে গেছি!"
পিতামহ আর মাতাপিতার কণ্ঠস্বর!
নীলিমা ধড়ফড় করে উঠে বসল। তার শরীর তখনও অবশ। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে দেউড়ির দিকে ছুটে গেল এবং দেউড়ির ভারী অর্গল দুটি উন্মুক্ত করে দিল।
দরজা খুলতেই মা ভেতরে প্রবেশ করে নীলিমার ফ্যাকাশে মুখ আর চোখের নিচের কৃষ্ণবর্ণ কালি দেখে আঁতকে উঠলেন—"কী হয়েছে তোর নীলু? মুখটা এমন শুকিয়ে গেছে কেন? রাতে ঘুমাসনি?"
নীলিমা কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না। সে কোনো কথা না বলে সোজা বাড়ির পেছনের উঠোনে জানালার নিচে গিয়ে দাঁড়াল। তার পেছনে পিতা ও মাতা কৌতূহলী হয়ে এলেন।
জানালার নিচের ভিজে মাটিতে নীলিমা যা প্রত্যক্ষ করল, তাতে সকালের মিষ্টি রোদেও তার মেরুদণ্ড দিয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল।
সেখানে মানুষের কোনো পদচিহ্ন নেই। কোনো হিংস্র পশুর থাবার দাগও নেই।
কিন্তু সেখানকার ভিজে মাটির ওপর ছড়িয়ে রয়েছে রুপালি-ছাই রঙের এক অদ্ভুত সূক্ষ্ম গুঁড়ো, যা কোনো সাধারণ কাষ্ঠ ছাই নয়। আর ঠিক সেই ছাইয়ের ওপর দুটো বড় বড় গোলাকার চিহ্ন—যেন তীব্র উত্তপ্ত দুটি গোল বস্তু মাটির ওপর চেপে ধরা হয়েছিল, যার ফলে নিচের মাটি ও ঘাস পুড়ে কালো হয়ে গেছে!
আর সেই দুটো গোল ছাইয়ের চিহ্নের মাঝখানে ফুটে উঠেছে একটি অদ্ভূত সংকেত। ওটা কোনো মানবীয় ভাষা বা অক্ষর নয়, কোনো চেনা আকৃতিও নয়। কিন্তু তা দেখলে মনে এক অদ্ভুত শঙ্কা জাগে—ওটা যেন কোনো চূড়ান্ত বিদায় সংকেত নয়, ওটা হলো ফিরে আসার এক নীরব অঙ্গীকার!
নীলিমার পিতা মাটির দিকে তাকিয়ে কপালে ভাঁজ ফেললেন—"এটা কিসের দাগ রে? রাতে কোনো বুনো পশু এসেছিল নাকি?"
নীলিমা কোনো জবাব দিল না। সে চোখ তুলে পেছনের ঘন বাঁশঝাড় আর পুরোনো বটগাছটার দিকে তাকাল।
দিনের উজ্জ্বল আলোতেও সেই সবুজ বাঁশঝাড়ের ঘন অন্ধকার কোণটাকে আজ কেমন যেন থমথমে, রহস্যময় আর প্রাচীন আতঙ্কে ভরা মনে হলো।
ওটা ঠিক কী ছিল? কোনো বহু পুরোনো অভিশপ্ত অবয়বহীন সত্তা? প্রকৃতির কোনো অজানা অলৌকিক প্রকাশ? নাকি নীলিমার নিজের মনেরই কোনো গভীর নিঃসঙ্গ আতঙ্কের প্রচ্ছায়া? বাইরে যা এসেছিল, তা কি ভোরের আলো দেখে ক্ষণেকের জন্য পিছু হটল... নাকি সে আবার ফিরে আসবে কোনো এক অমাবস্যার নিশিরাতে, যখন আবার এই ভিটে জনমানবহীন হবে?
উত্তরের খোঁজে প্রাতঃকালীন বাতাস শুধু বাঁশঝাড়ের পাতায় এক দীর্ঘ, রহস্যময় সোঁ সোঁ শব্দ তুলে চলে গেল...
লেখক - আলীম বাবু
Tags
# ভৌতিক গল্প
About বাংলা গল্পসল্প
Templatesyard is a blogger resources site is a provider of high quality blogger template with premium looking layout and robust design. The main mission of templatesyard is to provide the best quality blogger templates.
Related Posts:
ভৌতিক গল্প
Labels: photos
ভৌতিক গল্প
Subscribe to:
Post Comments (Atom)


No comments:
Post a Comment