পরম যুক্তির ওপারে
ঝাড়খণ্ডের ছোটনাগপুর মালভূমির কোলে এক চিলতে নির্জন পাহাড়ি জনপদ—ঘাটশিলা বা রাঁচির মূল শহর থেকে অনেকটাই দূরে, পাহাড় আর শাল-শিমুলের জঙ্গলে ঘেরা অচেনা এক উপত্যকা, নাম তার 'ধুলিয়াং'। শীতের তীব্রতা সবে কমতে শুরু করেছে। বাতাসে পৌষের সেই কনকনে ভাবটা আর নেই, তার বদলে ছাতিম আর মহুয়ার কুঁড়ি গজানোর হালকা মিষ্টি গন্ধ। পলাশগাছে এখনও ফুল পুরোপুরি না ফুটলেও ডালগুলোতে লালচে আভা লাগতে শুরু করেছে।
আমি পেশায় লেখক। শহরের ইট-কাঠ-পাথরের জাঁতাকল আর প্রতিনিয়ত শব্দের পেছনে ছোটার ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতেই আমার এই নিঃসঙ্গ যাত্রা। ধুলিয়াংয়ের পাহাড়ের গায়ে ব্রিটিশ আমলের একটা কাঠের ডাকবাংলোতে উঠেছি। উদ্দেশ্য—একান্তে কিছুদিন বই পড়া, ভাবা আর নতুন একখানা উপন্যাসের খসড়া তৈরি করা।
সেদিন ছিল ফাল্গুনের প্রথম দিককার এক বিকেল। সূর্য তখন পশ্চিমের পাহাড় চূড়ার পেছনে নামতে শুরু করেছে। পাহাড়ি উপত্যকায় নামছে গাঢ় বেগুনি আর কমলা রঙের এক অপূর্ব আলোর খেলা। ডানদিকের গহীন শালবনের ভেতর দিয়ে মেঠো পথ ধরে আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম ডাকবাংলোর পেছনের পাহাড়ের চূড়ায় থাকা একটা পুরানো পরিত্যক্ত ওয়াচটাওয়ারের দিকে।
ঠিক সেই নির্জন মোড়ে, একটা প্রকাণ্ড বুড়ো ছাতিম গাছের নিচে কাঠের বেঞ্চটায় মানুষটিকে প্রথম দেখলাম।
লোকটির বয়স আনুমানিক পাত্তর থেকে আশির কোঠায়। পরনে ধবধবে সাদা থান, মাথায় পশমি টুপি আর হাতে একটা মেহগনি কাঠের ছড়ি। চেহারাটা অত্যন্ত দীর্ঘ আর শীর্ণ, তবে চোখের মণিতে এক অদ্ভুত, তীক্ষ্ণ বুদ্ধির দীপ্তি।
আমার জুতোয় শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ হতেই লোকটা মাথা তুললেন। কণ্ঠস্বর এত গম্ভীর যে মনে হলো পাহাড়ের খাঁজে সেই শব্দ ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল।
“শহরের মানুষ, তাই তো? এই ফাল্গুনের সন্ধ্যায় প্রকৃতির নির্জনতা চুরি করতে এসেছেন?”
আমি একটু চমকে উঠে মৃদু হেসে বললাম, “চুরি নয়, বলতে পারেন ধার করতে এসেছি। শহরের কোলাহল মনটাকে বড্ড খাঁচা বানিয়ে দেয়। আপনি বুঝি স্থানীয়?”
লোকটা একটু অদ্ভুত হাসি হাসলেন। “স্থান তো শরীরের বিষয়, আত্মার কি কোনো নির্দিষ্ট স্থান থাকে? বসুন না। পাহাড়ের সন্ধ্যাকে তাড়াহুড়ো করে দেখতে নেই, তাকে ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে পান করতে হয়।”
আমি লোকটির পাশে বেঞ্চের এক কোণে বসলাম। ছাতিম গাছের পাতা বেয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে খুব দ্রুত।
লোকটি হঠাৎ আমার চাদর জড়ানো হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি তো লেখক। যুক্তি আর বাস্তবতার বুনোন বুনে মানুষকে সত্যের বিভ্রান্তি বেচেন। বলুন তো, ঈশ্বর সম্পর্কে আপনার মতামত কী?”
আমি গলা পরিষ্কার করে বুদ্ধিজীবীর ঢঙে বললাম, “ঈশ্বর? ঈশ্বর তো মানুষের আদিম অস্তিত্ব রক্ষার এক করুণ আশ্রয়প্রয়াসী কল্পনা। আদিম মানুষ যখন বজ্রপাত বা ঝড় দেখে ভয় পেয়েছিল, তখন নিজের অসহায়তাকে ঢাকার জন্য একজন মহাজাগতিক অভিভাবক তৈরি করে নিয়েছিল। বিজ্ঞানের যুগে ঈশ্বর কেবল মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতার প্রতীক।”
লোকটি মৃদু হেসে কাঠের ছড়িটা তুলে মাটিতে একটা বৃত্ত আঁকলেন। “বেশ যুক্তিযুক্ত উত্তর। কিন্তু যদি ঈশ্বর না থাকেন, তবে এই যে অদৃশ্য সুশৃঙ্খল মহাবিশ্ব, প্রকৃতির এই সুনির্দিষ্ট গণিত—এর নিয়ন্তা কে? পদার্থবিজ্ঞানের জটিল তত্ত্ব দিয়ে কি সৃষ্টির আদি কারণকে ব্যাখ্যা করা যায়?”
আমি তক্ষণি কাটাকাটি করে বললাম, “নিশ্চয়ই যায়! আমরা তাকে বলি 'প্রাকৃতিক নিয়ম' বা ন্যাচারাল ল। বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে মহাজাগতিক পদার্থের বিবর্তন—সবটাই কোয়ান্টাম মেকানিক্স আর পদার্থবিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট সূত্রে বাঁধা। এর জন্য কোনো অলৌকিক ঈশ্বর রূপকারকে সিংহাসনে বসানোর দরকার নেই। এটা শুধুই পদার্থের ভৌত ধর্ম।”
আগন্তুক এবার হাত দুটো বুকের ওপর বাঁধলেন। “চমৎকার। আপনি তবে বস্তুবাদী যুক্তিবাদী। কিন্তু মশাই, যদি ঈশ্বরকে আপনি স্রেফ মানবমস্তিষ্কের কল্পনা বলে উড়িয়ে দেন, তবে প্রেতাত্মা বা মৃত্যুর পর কোনো শক্তির উপস্থিতি—এগুলোকেও কি একই পাল্লায় মেপে অবাস্তব বলবেন?”
“অবশ্যই!” আমি অত্যন্ত জোর দিয়ে বললাম। “ঈশ্বর যদি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আশার প্রতীক হন, তবে ভূত হলো মানুষের আদিম অপরাধবোধ আর অন্ধকারকে ভয়ের ফসল। বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত একটাও ভূতের উপস্থিতি প্রমাণ করতে পারেনি। মানুষের নিউরনের রাসায়নিক সাম্য হারিয়ে গেলে, কিংবা ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশন হলে মানুষ ভূত দেখে। ভূত বলে কিছু নেই, ওটা মস্তিষ্কের একটা কেমিক্যাল গ্লিচ ছাড়া আর কিছুই নয়।”
আগন্তুক এবার একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখেমুখে এক অদ্ভুত চ্যালেঞ্জের ছায়া ফুটল।
“আচ্ছা লেখক মহাশয়, এবার আপনাকে একটা পরম যৌক্তিক আর বৈজ্ঞানিক গোলকধাঁধায় নিয়ে যাই। ভালো করে ভাবুন। আপনি বললেন ঈশ্বর নেই এবং ভূতও নেই। কিন্তু আমি বলছি, আপনি যদি পরম যুক্তিতে ঈশ্বরকে অস্বীকার করেন, তবে ঈশ্বরহীন এই মহাবিশ্বে ভূতের অস্তিত্বকে স্বীকার করতেই হবে! আর যদি ভূতের অস্তিত্ব থাকে, তবে ঈশ্বরকেও মানতে হবে। দুটো বিষয় একই সমীকরণের দুই পিঠ!”
আমি হেসে ফেললাম। “এ তো সম্পূর্ণ কুযুক্তি ও বৈপরীত্য! যে বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়ে আমি ঈশ্বরকে খণ্ডন করছি, সেই একই যুক্তি তো ভৌত অস্তিত্বহীন ভূতকেও বাতিল করে দেবে!”
আগন্তুক ছড়ি দিয়ে মাটিতে আঁকা বৃত্তটার ঠিক মাঝে একটা বিন্দু আঁকলেন।
“শুনুন তবে। বিজ্ঞান আমাদের শেখায় 'ল অফ কনজারভেশন অফ এনার্জি' বা শক্তির নিত্যতা সূত্র। শক্তি কখনও ধ্বংস বা সৃষ্টি হয় না, রূপান্তর ঘটে মাত্র। মানুষের শরীর যদি কেবল পদার্থের পুঞ্জ হয়, তবে মানুষের চেতনা, চিন্তা, অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা—যেটাকে আমরা 'লাইফ ফোর্স' বা জীবনশক্তি বলি—সেটা তো একপ্রকার শক্তি? শরীর যখন মৃত্যুর পর ধ্বংস হয়ে যায়, তখন সেই বিপুল মানসিক চেতনা-শক্তিটি হঠাৎ কোথায় বিলীন হয়? শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া তো পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মের পরিপন্থী!”
আমি সঙ্গে সঙ্গে যুক্তির পাল্টা চাল চাললাম। “ভুল করছেন। চেতনা কোনো স্বতন্ত্র শক্তি নয়! চেতনা হলো মস্তিষ্কের কোটি কোটি নিউরনের ইলেকট্রো-কেমিক্যাল নেটওয়ার্কের একটা 'ইমারজেন্ট প্রপার্টি'। ঠিক যেমন কম্পিউটারের পার্টসগুলো খুলে ফেললে অপারেটিং সিস্টেমটা শূন্যে ভেসে থাকে না, ধ্বংস হয়ে যায়—একইভাবে মস্তিষ্ক মারা গেলে নিউরনের বিদ্যুৎপ্রবাহ বন্ধ হয়, চেতনাও চিরতরে হারিয়ে যায়! কোনো আত্মা তৈরি হয়ে বাতাসে ভাসতে থাকে না।”
আগন্তুক দমে গেলেন না, বরং আরো একধাপ এগিয়ে এলেন।
“বেশ কথা। আপনি রূপক হিসেবে কম্পিউটারের কথা বললেন। কিন্তু যদি ধরা যায়, পরমেশ্বর বলে কোনো স্রষ্টা সত্যি নেই—অর্থাৎ এই বিশ্ব সংসার কোনো প্রেমময় পরমাত্মার তৈরি নয়, এটি সম্পূর্ণ এক নির্দয়, বিশৃঙ্খল ও দৈব মহাজাগতিক দুর্ঘটনাসূত্রে তৈরি ‘র্যান্ডম ইউনিভার্স’—তবে তো আরো ভয়ের কথা! যদি কোনো ঈশ্বর না থাকেন যিনি ন্যায়ের বিচার করবেন, পাপ-পুণ্যের হিসেব রাখবেন কিংবা মৃত্যুর পর আত্মাকে শান্তি দেবেন, তবে মৃত্যুর পর মানুষের অতৃপ্ত ইচ্ছা, অপমৃত্যুর যন্ত্রণা বা তীব্র রাগ মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে কোনো উচ্চতর অদৃশ্য তরঙ্গে বা ফ্রিকোয়েন্সিতে রূপান্তরিত হওয়াই তো স্বাভাবিক! ঈশ্বর থাকলে তো তিনি প্রেতাত্মাদের বিচার করে নরকে বা স্বর্গের নিগড়ে আটকে রাখতেন। কিন্তু ঈশ্বর যদি না-ই থাকেন, তবে তো তারা মুক্ত! তারা মহাবিশ্বের কোনো সমান্তরাল মাত্রায় (Parallel Dimension) শক্তি হিসেবে ভেসে বেড়াবে এবং জীবিত মানুষের দুর্বল মনস্তাত্ত্বে প্রভাব ফেলবে! ঈশ্বরহীন পৃথিবীতেই তো ভূত হওয়ার সুযোগ সবচেয়ে বেশি!”
আমি কিছুক্ষণ থমকে গেলাম। লোকটির যুক্তি অসাধারণ এবং তীক্ষ্ণ! কিন্তু এক মুহূর্ত পরেই আমার যুক্তিবাদী মন আবার সক্রিয় হলো।
আমি চশমাটা ঠিক করে নিয়ে বললাম, “আপনার যুক্তি অত্যন্ত চতুর বৈজ্ঞানিক মারপ্যাঁচ, কিন্তু এতে বিরাট গলদ আছে! প্রথমত, আপনি চেতনাকে বাহ্যিক শক্তি হিসেবে ধরে নিচ্ছেন, যা ভুল। দ্বিতীয়ত, প্যারালাল ডাইমেনশন বা উচ্চতর মাত্রার শক্তির কথা আপনি বলছেন—সেটা বিজ্ঞান এখনো অনুমান হিসেবে দেখে, ভূতের রাজ্য হিসেবে নয়। আর আপনি বলছেন ঈশ্বর না থাকলে প্রেতাত্মারা স্বাধীনভাবে ভেসে বেড়াবে। কিন্তু কোনো কিছুর 'অতৃপ্ত ইচ্ছা' বা 'পাপ-পুণ্য'—এগুলো তো সম্পূর্ণ মানবিক আবেগ ও সামাজিক ধারণা! প্রকৃতির কাছে আলো, অন্ধকার, অপরাধ বা ইচ্ছা বলে কিছু নেই। প্রকৃতির কাছে শুধুই এন্ট্রপি (Entropy) বা বিশৃঙ্খলা। মানুষ মারা গেলে তার জৈব পরমাণু প্রকৃতিতে মিশে যায়। কোনো ভৌত আইনই এটা অনুমোদন করে না যে স্মৃতি বা রাগ বায়ুমণ্ডলে স্বাধীন শক্তি হিসেবে কোনো অবয়ব নিয়ে ঘুরে বেড়াবে!”
আগন্তুক অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কুয়াশা এখন আমাদের চারপাশে ঘিরে ধরেছে। পাহাড়ি সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে চতুর্দিক।
লোকটি এবার নিচু গলায় বললেন, “যুক্তি দিয়ে আপনি বিশ্বকে বাঁধতে চান লেখক। কিন্তু আপনি কি নিশ্চিত যে মানুষের বিজ্ঞান এবং যুক্তিই এই অনন্ত মহাবিশ্বের শেষ কথা? বিজ্ঞান তো পর্যবেক্ষণভিত্তিক। একসময় বিজ্ঞান বিশ্বাস করত পৃথিবী সমতল, পরে তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আজ বিজ্ঞান যা পরীক্ষা করে দেখতে পাচ্ছে না, তাকেই বলছে 'অবাস্তব'। কিন্তু যা অদৃশ্য, তা কি সত্যি নেই? এই যে অন্ধকারে বসে আছি—আপনি কি আমাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন? কিন্তু আমি তো আপনার সামনেই আছি!”
আমি উঠে দাঁড়ালাম। আত্মবিশ্বাসী গলায় বললাম, “দর্শন দিয়ে সত্যকে চেনা যায়, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বিজ্ঞান ক্রমাগত নিজের ভুল সংশোধন করে এগোয়, কিন্তু কুসংস্কার এক জায়গায় স্থবির হয়ে থাকে। আপনার এই ঈশ্বর আর ভূতের তত্ত্ব হলো মানুষের না-জানার ভয়কে সুন্দর মোড়কে সাজিয়ে পরিবেশন করা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি যুক্তি আর প্রমাণের বাইরে কোনো অলৌকিকতায় বিশ্বাস করতে রাজি নই। এই যুদ্ধে জয় যুক্তিরই!”
আগন্তুকও ধীরে ধীরে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর শীর্ণ লম্বা শরীরটা কুয়াশার আবছায়ায় যেন আরও দীর্ঘ মনে হলো।
তিনি এক অদ্ভুত নিঃশব্দ হাসি হাসলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর কেমন যেন অচেনা এবং ভারী হয়ে এল।
“তাহলে একটা শেষ পরীক্ষা হয়ে যাক, লেখক মহাশয়,” লোকটির গলা এবার যেন আর কোনো মানুষের গলা নয়, পাহাড়ের খাঁজ থেকে আসা এক শীতল প্রতিধ্বনি।
“আপনি বলছেন জীবিত মানুষের যুক্তিই শেষ কথা। অদৃশ্য যা কিছু, তা মানুষের হ্যালুসিনেশন। তবে শুনুন—আজ থেকে ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে, এই ধুলিয়াংয়ের এই ছাতিম গাছের নিচে বসেই এক ফাল্গুনের সন্ধ্যায় এক তরুণ যুক্তিবিদ এমনই এক বৃদ্ধের সঙ্গে ঈশ্বর আর ভূতের অস্তিত্ব নিয়ে দীর্ঘ তর্কে মেতেছিলেন। তরুণটি তাঁর আধুনিক যুক্তিতে বৃদ্ধকে কোণঠাসা করে দিয়ে বিজয়ের হাসিতে পাহাড় থেকে নেমে যান। আর সেই পরাজিত বৃদ্ধ নিজের বিশ্বাসের পরাজয় সহ্য করতে না পেরে, সেই রাতেই এই ছাতিম গাছের ডালে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন...”
আমার মাথার ভেতরটা যেন এক মুহূর্তে খালি হয়ে গেল। গায়ের রোম খাড়া হয়ে উঠল। “এ... এ অসম্ভব! এ আপনার বানানো গল্প!”
লোকটি আমার একদম কাছে এগিয়ে এলেন। তাঁর চোখের মনি দুটোতে শেষ সন্ধ্যার আলোর কোনো প্রতিফলন ছিল না—একদম নিখাদ অন্ধকার।
“গল্প নয়, লেখক। সেই বিজয়ী তরুণটি ছিলেন আপনারই প্রপিতামহ—শ্রদ্ধেয় বৃদ্ধ যুক্তিবাদী, যাঁর যুক্তিভিত্তিক বই পড়ে আপনার পরিবারের চেতনা গড়ে উঠেছে! আর সেই হেরে যাওয়া বৃদ্ধটি... আজ পঞ্চাশ বছর ধরে এই ছাতিম তলায় প্রতিটি ফাল্গুনে অপেক্ষা করেন। তিনি কোনো নতুন যুক্তিবাদীকে হারাতে চান না, শুধু দেখতে চান—মানুষের অহংকারী যুক্তি ঈশ্বর আর আত্মার অনন্ত রহস্যের সামনে কতটা অসহায়!”
কথাটা শেষ হতেই ফাল্গুনের মিহি হাওয়া এক প্রচণ্ড ঘূর্ণিবায়ুতে রূপ নিল। পাইন আর ছাতিমের পাতাগুলো বিকট শব্দে কাঁপতে লাগল।
আমি আতঙ্কে ব্যাকুল হয়ে পকেট থেকে পিতলের পুরানো দেশলাইটা বের করে একটা কাঠি জ্বালালাম। শিখার ক্ষণস্থায়ী আলোটা লোকটির মুখের ওপর ফেলতেই আমার বুকের রক্ত জমে বরফ হয়ে গেল!
ছাতিম গাছের নিচে কোনো মানুষ দাঁড়িয়ে নেই। দেশলাইয়ের শিখার আলোয় বাতাসের মাঝে কয়েক মুহূর্তের জন্য ভেসে রইল এক ধোঁয়াটে অবয়ব—যা এক বিষণ্ন তৃপ্তি নিয়ে কুয়াশার গভীরে মিলিয়ে গেল!
দেশলাইয়ের কাঠিটা আমার আঙুল থেকে পড়ে নিভে গেল। ফাল্গুনের অন্ধকারের মাঝে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা তীব্র আতঙ্কের স্রোত বয়ে গেল। আমার সমস্ত বস্তুবিজ্ঞান, সমস্ত কোয়ান্টাম মেকানিক্স আর অহংকারী যুক্তি সেই মুহূর্তে খড়কুটোর মতো বাতাসে উড়ে গেল। আমার সারা জীবনের গড়ে তোলা বিজ্ঞানের অহংকার এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

No comments:
Post a Comment