বাংলা গল্পসল্প

"BanglaGolpoSolpo" is all about Bengali stories, Bengali Poems, Articles etc. 'বাংলা গল্পসল্প'র তরফ থেকে সকল পাঠকগণ, শ্রোতাগণ ও লেখকবন্ধুদের জানাই হার্দিক অভিনন্দন, ভালোবাসা, প্রীতি ও শুভেচ্ছা এবং শুভকামনা। এই অনলাইন পাবলিশিং ওয়েবসাইটটির অনবদ্য প্রচেষ্টা স্বরূপ বিভিন্ন ধরনের বাংলা সাহিত্যের উন্মোচনের মাধ্যমে বাংলা জগতের গর্বিত বাঙালীর সন্নিকটে নবাগত তরুণ প্রজন্মের সাহিত্যিকগণের আত্মপ্রকাশ করার নিতান্তই একটি প্রয়াসমাত্র ।

Wikipedia

Search results

Pageviews

নিচের follow button টির দ্বারা আপনি এই ওয়েবসাইট টি follow করতে পারেন ।

Monday, 10 August 2026

‘স্নিগ্ধ হাসি’ / 'বাংলা গল্পসল্প' নিবেদিত একখানা ছোট্ট রোমাঞ্চকর গল্প ।

স্নিগ্ধ হাসি

বিকেলের সোনাঝরা নরম রোদ তখন মাঠের সবুজ গালিচায় ছড়িয়ে দিয়েছে শান্ত অলৌকিক এক আলোকচ্ছটা। বয়সটা আমার তখন উনিশ কিংবা কুড়ি—জীবনের সেই এক অদ্ভুত সোনালী সন্ধিক্ষণ, যখন কৈশোরের চপলতা ডানা গুটিয়ে প্রৌঢ় গাম্ভীর্যের দিকে এগোয়, আর রক্তে দোলা দেয় নাম না জানা অকারণ উন্মাদনা। 
পকেটে ধনদৌলত বলতে কিছুই ছিল না, কিন্তু বুকে ছিল এক বিশাল উদাসীন আকাশ আর অনুভূতির প্রগাঢ় পেলবতা। আমার সমস্ত একাকীত্ব আর নীরব ভবঘুরেপনার একমাত্র বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিল এক পুরোনো অ্যাটলাস সাইকেল। তার চেইন আর প্যাডেলের ম্লান ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ বিকেলের উজান হাওয়াকে কেটে যখন মেঠো পথে ছড়িয়ে পড়ত, মনে হতো পৃথিবীর সমস্ত অধরা স্বাধীনতা যেন ওই দুটো চাকার ঘূণিপাকে বন্দি। 

সেদিন বিকেলটা একটু অন্যরকম ছিল। মাথার ওপর মেঘমুক্ত শান্ত নীল আকাশ, আর বাতাসের গায়ে এক মাতাল করা সোঁদা মাটির গন্ধ। প্রতিদিনের চেনা পথ ছেড়ে সেদিন এক অজানা মেঠো পথ ধরেছিলাম। গ্রামের কোলাহল, মেঠো বাজার আর আমবাগানগুলো পেছনে ফেলে লাল ধুলোর এক নিরবচ্ছিন্ন মেঠো রাস্তা ধরে কত দূর চলে গেলাম, খেয়াল ছিল না।

হঠাৎ করেই সেই লাল ধুলোর পথ এসে মেশে এক সীমান্তহীন, বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে। স্থানটিতে পা রাখতেই মনে হলো, কালস্রোতের চাকা যেন এখানে এসে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে। লোকালয় থেকে অনেকটাই দূরে এক নির্জন, রহস্যময় প্রাঙ্গণ। একপাশে সুদীর্ঘ ঝাউগাছের সারি হাওয়াতে মাথা দোলাচ্ছে, আর অন্যপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক প্রকাণ্ড মহীরূহ—প্রাচীন বটবৃক্ষ। কত শত বছরের সাক্ষী সে, তার অজস্র ঝুলন্ত জটা মাটিকে স্পর্শ করে এক অদ্ভুত মায়াবী জগত তৈরি করেছে। চারপাশে এক নিবিড়, গভীর নীরবতা; কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে তান আর দূর থেকে ভেসে আসা রাখাল বালকের করুণ বাঁশির সুর। 

আমি সাইকেলের ব্রেক চেপে ধীর পায়ে মাটির ওপর পা রাখলাম। চারপাশের সেই মায়াবী নিস্তব্ধতা উপভোগ করার জন্য যেমনই চোখ ঘুরিয়েছি, ঠিক তখনই—বটবৃক্ষের সেই সুশীতল, অন্ধকারাচ্ছন্ন ছায়ায়, ঝরে পড়া লাল পাতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে প্রথম দেখলাম। 

মেয়েটির বয়স কতই বা হবে, হয়তো পনেরো কি ষোলো। পরনে অতি সাধারণ এক সুতি শাড়ি। বিকেলের হাওয়া তার কাঁধ ছুঁয়ে যাওয়া আলগা কালোচুলগুলোকে দুলিয়ে দিচ্ছিল। হাওয়ার প্রতিটি ঝাপটায় তার হাতের কাঁচের চুড়িগুলোর অতি সূক্ষ্ম এক টুংটাং শব্দ আর চারপাশের বাতাসে ছড়ানো অচেনা এক বুনো ফুলের মিষ্টি সুবাস যেন পুরো পরিবেশটাকে অবাস্তব করে তুলছিল। তার রূপ কোনো অহংকারী রাজকন্যার মতো চড়া ছিল না, ছিল ভোরের শিশিরভেজা শিউলি ফুলের মতো পবিত্র ও চমৎকার। আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। 

হঠাৎ মেয়েটি মুখ ফেরাল। আমার দিকে তাকাল। তার সেই দুটি চোখে কোনো দ্বিধা ছিল না; ছিল এক অতল দীঘির নীরব গভীরতা। আর ঠিক তার পর মুহূর্তেই ঘটল সেই মহাজাগতিক অলৌকিক ঘটনাটি।
মেয়েটির গোলাপী ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক মৃদু, অত্যন্ত স্নিগ্ধ হাসি। 

কী ছিল সেই হাসিতে! কোনো শব্দ ছিল না, কোনো প্রগলভতা ছিল না, অথচ সেই অনুচ্চারিত হাসির এক ঝলক আমার বুকে এক প্রচণ্ড কালবৈশাখীর ঝড় তুলে দিল। হাজার হাজার অলকানন্দা যেন একসাথে আমার শিরা-উপশিরায় বইতে শুরু করল। সেই স্নিগ্ধ হাসিটি এক অদৃশ্য মায়ার শৃঙ্খল দিয়ে আমার পুরো অস্তিত্বকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল। সময় থমকে গেল, বাতাস স্তব্ধ হলো—আমি শুধু এক পরম মোহাচ্ছন্নতায় তার দিকে চেয়ে রইলাম। সে হাসল, আর তার ঠিক পর মুহূর্তেই বটগাছের বিশাল গুঁড়ির আড়ালে মায়ার মতো মিলিয়ে গেল। 

আমি সাইকেলটা ফেলে দিয়ে ব্যাকুল হয়ে ছুটে গেলাম বটগাছটার পেছনে।
"শুনছেন...?" আমার গলা দিয়ে কাঁপাকাঁপা শব্দ বেরোল।
কিন্তু সেখানে কেউ ছিল না। গাঢ় নীরবতা ছাড়া আর কিছুই আমাকে অভ্যর্থনা জানাল না। গাছেদের আড়ালে কেবল মাইলের পর মাইল ফাঁকা ধানি জমি বিস্তৃত। এত কম সময়ে একজন রক্তমাংসের মানুষ কোথায় যেতে পারে? আমি বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার মনে হলো, আমার ভেতরের চিরন্তন প্রেমিক হৃদয়টি চিরতরে ওই মেয়েটির স্নিগ্ধ হাসির কাছে বন্দি হয়ে গেছে। 

বাড়িতে ফিরে এলাম ঠিকই, কিন্তু সে শরীরমাত্র। মন, চেতনা আর আত্মা পড়ে রইল সেই নির্জন বটবৃক্ষটির তলে। সেই রাতে আর ঘুম এল না। চোখ বুজলেই বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠতে লাগল সেই মুখ, আর তার সেই এক ঝলকের তীব্র স্নিগ্ধ হাসি। এক ব্যাকুল প্রেমে বুকের ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠছিল। 

পরদিন বিকেলে আবার সাইকেল নিয়ে উন্মাদের মতো ছুটলাম। কিন্তু প্রাঙ্গণটি আজ একদম জনমানবহীন। বটগাছের তলাটা খাঁ খাঁ করছে। আমি সাইকেলের বেল বাজিয়ে পুরো মাঠটা চক্কর মারলাম, কিন্তু কাউকে পেলাম না। 

তার পরের দিন, তারও পরের দিন—প্রতিটি বিকেল কাটতে লাগল সেই একই মাঠে, সাইকেল নিয়ে ব্যাকুলভাবে ঘুরপাক খেয়ে। কিন্তু প্রতিটি বিকেলের শেষে আমার ঝোলা ভরে উঠত কেবল এক গহন নৈরাশ্য আর না-পাওয়ার তীব্র বেদনায়। 

দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে যেতে লাগল। বৈশাখে কালবৈশাখী এলো, শ্রাবণের অঝোর ধারায় ভিজল সেই প্রাচীন বটবৃক্ষ। কিন্তু সে আর এল না। কোনোদিন না। আমি সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতাম, আর বুকের ভেতর চেপে রাখতাম এক না-পাওয়ার নীল কষ্ট। সেই কষ্টটা এতই মধুর ছিল যে, মনে হতো এ কষ্টেই আমার প্রেমিকজন্ম সার্থক। 

ধীরে ধীরে কালের নিয়মে অনেকগুলো বসন্ত পেরিয়ে গেল। জীবনের চাকা ঘুরল, শহরের যান্ত্রিক খাঁচায় এসে নিজেকে বন্দি করতে হলো। কত মুখ এল, কত রূপ হারিয়ে গেল। কিন্তু আজও যখন কোনো নিঝুম নির্জন বিকেলে জানালার পাশে বসি, আমার মনের কোণে সেই লাল ধুলোর প্রাঙ্গণটি ঠিক একইভাবে ভেসে ওঠে। 

আজ জীবনের এই প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজেকে বারবার একই প্রশ্ন করি—সে কি সত্যিই রক্তমাংসের কোনো কিশোরী ছিল? নাকি বৈকালের রোদ, বটবৃক্ষের ছায়া আর আমার উনিশ বছরের উদাসীন মনের কল্পনার মিশেলে তৈরি এক অলৌকিক দৃষ্টিভ্রম? 

আমি আজও এর উত্তর পাইনি। হয়তো সে ছিল এক রূপাতীত মায়া, হয়তো কোনো কিশোরীর সত্যি সত্যিই হেসে ফেলা এক নিষ্পাপ হাসি। কিন্তু সেই রহস্যময়ী আজও আমার জগতে অমলিন। আজও যখন কোনো শান্ত বিকেলে হাওয়ায় পাতার মরমর শব্দ শুনি, বুকের বাঁ পাশটায় এক অদ্ভুত চেনা ব্যাকুলতা অনুভব করি। মনে হয়—আমার চিরকালের সেই না-পাওয়ার বেদনা, আর তার সেই স্নিগ্ধ হাসি সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে সেই প্রাচীন বটবৃক্ষের ছায়ায় আজও অবিনশ্বর হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে।


                                                                                                                           লেখক - আলিম বাবু

No comments:

Post a Comment