Wikipedia
Search results
Pageviews
নিচের follow button টির দ্বারা আপনি এই ওয়েবসাইট টি follow করতে পারেন ।
Monday, 10 August 2026
Home
/
অন্যান্য গল্প
/
রহস্য গল্প
/
যাকে কেউ দেখে না / 'বাংলা গল্পসল্প' নিবেদিত একখানা ছোট্ট রোমাঞ্চকর গল্প ।
যাকে কেউ দেখে না / 'বাংলা গল্পসল্প' নিবেদিত একখানা ছোট্ট রোমাঞ্চকর গল্প ।
শহরের বুকের ওপর তখনো অন্ধকার আলগা হয়নি। শেষ রাতের জমাট কুয়াশা যেন কোনো প্রাচীন শতাব্দীর ধোঁয়াটে স্মৃতি হয়ে রাজপথের ওপর ঝুলছে। রোডলাইটের ফ্যাকাশে, অসুস্থ হলুদ আলোয় দীর্ঘ রাস্তাটাকে দেখায় কোনো নিঃসঙ্গ, সুপ্ত সরীসৃপের মতো।
আমি আমার দোতলার নির্জন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হাতে ধরা কাপের চা অনেক আগেই জুড়িয়ে জল। লেখার জন্য একটু নীরবতা খুঁজতে ভোরবেলায় জেগে থাকা আমার বহুদিনের অভ্যাস; কিন্তু ইদানীং আমার কলম থেমে থাকে, আর দৃষ্টি আটকে থাকে নিচের ওই অন্ধ গলিটার মুখে।
ঠিক ভোর চারটে বেজে বারো মিনিট। কুয়াশার চাদর চিরে সে আসছে।
উস্কোখুস্কো, জটপাকানো চুলের জঙ্গল, গায়ে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া এক জরাজীর্ণ প্রকাণ্ড কোট, আর খালি পায়ে জমে থাকা রাস্তার ধূলাবালি। প্রথম দর্শনে যে কেউ বলবে—সে কেবলই এক অভাগা, দিকভ্রষ্ট মানসিক ভারসাম্যহীন লোক। কিন্তু একজন লেখকের চোখ, যা কেবল দৃশ্যমানকে দেখে না, দৃশ্যমানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আদিম ভয় ও অব্যাখ্যাত কম্পনকেও অনুধাবন করে—সে চোখকে সে ফাঁকি দিতে পারেনি।
আজ পাঁচ মাস চব্বিশ দিন ধরে আমি তাকে পর্যবেক্ষণ করছি।
শুরুটা হয়েছিল অত্যন্ত সাধারণ ভাবে। একদিন সকালে বাজারের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে আসার সময় প্রথম তাকে লক্ষ্য করি। রাস্তার পাশে পচা মাছের বিশ্রী গন্ধ, মানুষের হাঁকডাক আর ধুলোর উত্তাপের মাঝে সে হেঁটে যাচ্ছিল। শহরের মানুষ তাকে এড়িয়ে চলছিল, যেন সে পথের কোনো অনাবশ্যক আবর্জনা। কিন্তু আমার নজর আটকে গিয়েছিল তার চলাচলের ভঙ্গিতে। একজন উন্মাদ মানুষের হাঁটার মধ্যে যে অসংলগ্নতা থাকে, তার মধ্যে তা ছিল না। তার প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল এক গাণিতিক নিখুঁত ভাব।
পরের সপ্তাহে আবার তাকে দেখলাম গঞ্জের মোড়ে। প্রচণ্ড রোদে যখন পিচ গলে যাচ্ছে, শহরের প্রতিটি কুকুর কোনো ছায়ার খোঁজে জিব বের করে হাঁপাচ্ছে, তখন সে সেই খাঁ খাঁ রোদের মধ্যে হেঁটে যাচ্ছে। তার পরনে সেই একই ভারী, ময়লা কোট। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়—তার কপালে একবিন্দু ঘামের রেখাও ছিল না। কোনো মানুষ কীভাবে তীব্র গ্রীষ্মে অত ভারী কোট পরে ঘাম ছাড়া হেঁটে বেড়াতে পারে?
কৌতূহলটা সেখান থেকেই বিষাক্ত লতার মতো আমার মগজে ডালপালা মেলতে শুরু করে। আমি আমার দৈনন্দিন কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে তাকে খোঁজা শুরু করলাম। কখনো বিকেলে লাইব্রেরি থেকে ফেরার পথে, কখনো বা রাত দুপুরে কোনো চায়ের দোকানের আড্ডার শেষে বাড়ি ফেরার সময়—আমি তাকে শহরের কোনো না কোনো কোণে হেঁটে যেতে দেখতাম।
ধীরে ধীরে তার প্রতিটা কার্যকলাপ আমি আমার দিনলিপিতে নথিভুক্ত করতে শুরু করলাম। আর যত দিন যেতে লাগল, রহস্যের ঘনত্ব ভয়ের মতো ঘন হয়ে আমার বুকের ওপর চেপে বসতে লাগল।
এই দীর্ঘ প্রায় ছ-মাসে আমি তাকে কোনোদিন একবিন্দু জল স্পর্শ করতে দেখিনি। শহরের মোড়ে ফেলে রাখা এঁটো খাবার, মিষ্টির দোকানের ফেলে দেওয়া শালপাতা কিংবা ডাস্টবিনের দিকে সে কোনোদিন ফিরেও তাকায়নি। তীব্র শীতে যখন শহরের ভবঘুরেরা রাস্তার পাশে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহায়, সে তখন কনকনে ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে একলা হেঁটে যায়। কোনো নেশা নেই, বিড়ি-সিগারেট তো দূরের কথা, কোনো মানুষের কাছে এক পয়সার সাহায্য চাইতেও তাকে কেউ কোনোদিন দেখেনি।
ক্ষুধা, তৃষ্ণা, শীত কিংবা গরম—মানবদেহের এই মৌলিক জৈবিক অনুভূতিগুলো যেন তার ওপর কোনো প্রভাবই ফেলতে পারে না।
সবচেয়ে ভয়ংকর এবং অলৌকিক বিষয় ছিল তার চোখ এবং দৃষ্টি।
সে কোনোদিন মানুষের চোখের দিকে তাকাত না। রাস্তায় শত শত মানুষ তার পাশ দিয়ে চলে যায়, গাড়ি ঘোড়া হর্ন বাজিয়ে চলে যায়—সেদিকে তার কোনো খেয়াল থাকত না। তার চোখ দুটি সর্বদা নিবন্ধ থাকত অসীম শূন্যে। ঠিক যেন আমাদের এই ত্রিমাত্রিক জগতের দৃশ্যমান বাস্তবতার বাইরে অন্য কোনো পরাবাস্তব বা অপার্থিব কিছু সে নিরন্তর প্রত্যক্ষ করছে। কখনো কখনো সে রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ থমকে দাঁড়াত। তারপর ঘাড় ঈষৎ কাত করে শূন্যের দিকে তাকিয়ে থাকত—যেন খুব দূর থেকে ভেসে আসা কোনো অদৃশ্য ডাক সে মনোযোগ দিয়ে শুনছে। কয়েক মুহূর্ত স্থির থাকার পর আবার সে হাঁটতে শুরু করত।
কোথা থেকে আসে সে? কোথায় যায়? শহরের উত্তর প্রান্তের শ্মশানঘাট থেকে শুরু করে দক্ষিণ প্রান্তের পরিত্যক্ত কারখানা পর্যন্ত সে হেঁটে বেড়ায়। কিন্তু রাত বারোটার পর সে কোথায় অদৃশ্য হয়ে যায়, পুরো মহল্লার কেউ তা বলতে পারে না। সবাই তাকে 'পাগল' বলে হেসেই উড়িয়ে দেয়। কিন্তু আমি জানতাম, এই উন্মাদের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর কিছু।
আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে শুরু করল। রাতে চোখ বুজলেই মনে হতো সেই লোকটার শূন্য দৃষ্টি আমার দিকে চেয়ে আছে। মনস্তাত্ত্বিক কৌতূহল একসময় এক আদিম, হিংস্র নেশায় পরিণত হলো। লোকটা কে? কোনো গোপন আন্তর্জাতিক গুপ্তচর সংস্থার ছদ্মবেশী বার্তাবহ? কোনো নিখুঁত অপরাধী যে শহরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নজর রাখছে? নাকি কোনো অশুভ অতিপ্রাকৃতিক সত্তা?
আজকের এই থমথমে, কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এই অমোঘ ধাঁধার শেষ আমি দেখেই ছাড়ব। আজ রাতে তার মুখোশ আমাকে উন্মোচন করতেই হবে।
ঘড়িতে তখন চারটে বেজে বারো মিনিট। আমি দোতলার ব্যালকনি থেকে দেখলাম, সে গলির মুখ থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে প্রধান রাস্তার দিকে যাচ্ছে। জ্যাকেটের টুপিটা মাথায় টেনে, পকেটে একটা ছোট টর্চ আর ক্যামেরা নিয়ে আমি নিঃশব্দে নিচে নেমে এলাম।
রাস্তায় কোনো লোক নেই। নিঝুম শহরের ওপর যেন মৃত্যুর নীরবতা নেমে এসেছে। স্ট্রিটলাইটের আলো কুয়াশায় ধাক্কা খেয়ে একধরনের অদ্ভুত লালচে ভুতুড়ে আভা তৈরি করেছে। সে সামনে হেঁটে চলেছে, আর আমি তার থেকে প্রায় ত্রিশ গজ দূরত্ব বজায় রেখে অন্ধকারের ছায়া ধরে অনুগামী হয়েছি।
তার হাঁটার গতি অদ্ভুত। কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই—এক অবিনশ্বর সময়জ্ঞানের মতো সে হেঁটে চলেছে। শহরের ঘুপচি গলি, বন্ধ দোকানের সারি আর পুরনো জীর্ণ অট্টালিকাগুলো পার হয়ে সে ধীরে ধীরে শহরের সীমান্ত এলাকার দিকে যেতে লাগল।
সেখানে রয়েছে বহু বছরের পুরনো, পরিত্যক্ত ডক ইয়ার্ড। একসময় যেখানে জাহাজ ভিড়ত, এখন সেখানে কেবল মরচে পরা কনটেইনার, ভাঙাচোরা জেটি আর আছড়ে পড়া কালো জল। জায়গাটা নিয়ে শহরে নানা কুসংস্কার আছে, রাতে ওখানে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, পুলিশও টহল দিতে ভয় পায়।
বাতাসে নোনা জলের সাথে জং ধরা লোহা আর পচা শ্যাওলার বিশ্রী গন্ধ। কুয়াশা এখানে এতই ঘন যে হাত চারেক দূরের জিনিসও দেখা কষ্টকর। টর্চ জ্বালানোর সাহস পাচ্ছিলাম না, পাছে সে টের পেয়ে যায়।
সে সোজা হেঁটে গিয়ে একটা বিশালাকার জীর্ণ জেটির একদম ডগায় গিয়ে দাঁড়াল। নিচে কালো জল এক আদিম রোষে কাঠের খুঁটিগুলোতে আছড়ে পড়ছে।
আমি একটা প্রকাণ্ড মরচে ধরা কনটেইনারের আড়ালে আত্মগোপন করলাম। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি এত তীব্র হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল চারপাশের নীরবতাকে তা চিরে ফেলবে। হাত কাঁপছিল, কপালে জমে উঠছিল হিমশীতল ঘাম। পকেট থেকে ক্যামেরাটা বের করে লেন্সটা কনটেইনারের পাশ দিয়ে বাড়ালাম। আজ তার আসল রূপ আমি ক্যামেরাবন্দী করব।
ঠিক তখনই... চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ থমকে গেল।
কোনো বস্ত্রখণ্ডের খসখস শব্দ হলো না, কাঠে কোনো পদশব্দ হলো না। সে অতি ধীরে আমার দিকে মুখ ফেরাল।
আমার বুকের রক্ত যেন মুহূর্তের মধ্যে বরফ হয়ে জমাট বেঁধে গেল। সে জানত! প্রথম মুহূর্ত থেকেই সে জানত যে আমি তার ছায়ার মতো পেছনে আছি। এই পুরো পথ সে আমাকে একপ্রকার ডেকে নিয়ে এসেছে।
তার পরনে সেই জরাজীর্ণ পোশাক, কিন্তু তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে এখন আর কোনো উন্মাদের অসাবধানতা ছিল না। সেখানে ছিল এক আধিভৌতিক মহিমা। আর তার চোখ দুটি... হে ঈশ্বর! সে সোজা তাকাল আমার চোখের দিকে।
সেই দৃষ্টির তীব্রতা কোনো মানবভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মনে হলো হাজার হাজার বরফশীতল সুঁচ একযোগে আমার মাথার খুলি ভেদ করে মগজে বিঁধে যাচ্ছে। একটা প্রচণ্ড ইলেকট্রিক শকের মতো অনুভূতি আমার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। আমার হাত থেকে ক্যামেরাটা খসে কাঠের ওপর পড়ে গেল, কিন্তু সেটা তোলার ক্ষমতা আমার ছিল না। আমার পুরো শরীর অবশ হয়ে গেল, পা দুটো যেন জেটির কাঠের সাথে পেরেক দিয়ে পুঁতে দেওয়া হয়েছে। কথা বলার জন্য মুখ খুলতে চাইলাম, কিন্তু গলা দিয়ে কেবল এক অস্ফুট ঘড়ঘড় শব্দ বের হলো।
সে এক পা-ও সামনে এগোল না। তার ঠোঁট দুটো সামান্যতম নড়ল না। কিন্তু তার সেই অনন্ত, অতল গভীর দৃষ্টির স্পন্দন সরাসরি আমার চেতনার গভীরে আছড়ে পড়ল—এক অস্ফুট, ভয়ঙ্কর ও দার্শনিক বার্তাকোডের মতো:
“হে ক্ষুদ্র নশ্বর জীব! আমাকে অনুসরণ কোরো না। যার কোনো নাম নেই, যার কোনো অতীত বা অবয়বের উপস্থিতি নেই, তাকে খোঁজা তোমার মতো সসীম সত্তার পক্ষে এক চরম ঝুঁকি। তোমরা মনে করো তোমরা এই শহরে বেঁচে আছ, ব্যবসা করছ, সাহিত্য সৃষ্টি করছ... কিন্তু তোমরা কেবল এক কাল্পনিক ভ্রমের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছ। এই ঘুমন্ত নগরে আমিই একমাত্র দ্রষ্টা—আমি সবাইকে অনুসরণ করছি। আমি পর্যবেক্ষণ করছি এই শহরের প্রতিটি নিঃশ্বাসের অন্তিম পরিণতিকে। আমাকে পিছু ধাওয়া করে তোমার এই অতি সংক্ষিপ্ত জীবনের অমূল্য সময় নষ্ট কোরো না... কারণ অসীমকে স্পর্শ করতে গেলে সসীমকে ধূলিকণায় বিলীন হয়ে যেতে হয়।”
আমার মাথার ভেতর এক তীব্র, অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হলো। কান দিয়ে যেন এক উচ্চগ্রামের শব্দ ভেদে প্রবেশ করছিল। চারপাশটা চড়কিপাকের মতো ঘুরতে লাগল, চোখের সামনে নেমে এলো অন্ধকার।
চেতনার শেষ আলোটুকু দিয়ে আমি দেখলাম, লোকটা কোনো দ্বিধা ছাড়াই জেটির শেষ প্রান্ত থেকে শূন্যে এক পা বাড়িয়ে দিল—সরাসরি নিচে গর্জনরত কুচকুচে কালো জলের ওপর।
কিন্তু কোনো ঝাঁপ দেওয়ার শব্দ হলো না। বিপুল জলরাশি ছিটে ওঠার কোনো আর্তনাদ মিলল না। বাতাস যেমন বাতাসকে স্পর্শ করতে পারে না, তেমনি সে যেন জলের ওপর স্রেফ মিলিয়ে গেল।
আমি কতক্ষণ সেখানে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম জানি না। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন ভোরের ফ্যাকাশে আলো ফুটতে শুরু করেছে। আমি পা টেনে টেনে উন্মত্তের মতো দৌড়ে জেটির মাথায় গিয়ে দাঁড়ালাম। পকেট থেকে টর্চ বের করে নিচে আলো ফেললাম।
নিচে কেবল কুচকুচে কালো জল নিজের মনে রোষে গর্জন করে চলেছে। কেউ নেই। কোথাও কিচ্ছু নেই।
কিন্তু যা দেখে আমার শরীরের শেষ রক্তবিন্দুটি পর্যন্ত জমে স্থির হয়ে গেল, তা হলো জেটির পুরোনো কাঠের ওপর জমে থাকা বহু বছরের পুরনো ঘন ধুলো আর নোনা আস্তর।
সেখানে কেবল আমার আসার জুতোজোড়ার বিশৃঙ্খলাভরা ছাপ।
সেই রহস্যময় ভবঘুরে লোকটার কোনো এককটি পদচিহ্ন সেই জমা ধুলোয় ছিল না! বিগত আধা ঘণ্টা ধরে সে যে এই কাঠের ওপর দাঁড়িয়েছিল, তার কোনো প্রমাণই নেই! এমনকি বাতাসে তার শরীরের বা পোশাকের বিন্দুমাত্র গন্ধও ছিল না—যেন কয়েক মুহূর্ত আগেও সেখানে কেউ দাঁড়িয়েছিল না, যেন সে কোনোদিন এই ধরায় পা-ই রাখেনি!
আজ তিন মাস হতে চলল। সেই শেষ রাতের পর থেকে... লোকটাকে আর কোনোদিন, এই শহরের কোথাও দেখা যায়নি।
সে যেন একরাতে সেই কুয়াশার সাথে চিরতরে বাতাসে মিশে গেছে।
কৌতূহলে উন্মাদ হয়ে আমি পাড়ার চায়ের দোকানদার, রাতের টহলদারি পুলিশ, এমনকি ডক ইয়ার্ডের মেথরদের কাছেও খোঁজ নিয়েছি। তাদের কথামতো—সে ছিল স্রেফ এক সাধারণ ভবঘুরে, যার কোনো পরিবার ছিল না। পুলিশের ধারণা, লোকটা হয়তো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে কোনোদিন অন্য কোনো শহরে হেঁটে চলে গেছে, কিংবা শেষ রাতে অলক্ষে জেটি থেকে পড়ে গিয়ে জলে ডুবে মরেছে। একজন রক্ত-মাংসের ছিন্নমূল মানুষের ক্ষেত্রে যা হওয়া অতি স্বাভাবিক।
কিন্তু যুক্তি দিয়ে মনকে বোঝালেও, আমার ভেতরের লেখক আর অভিজ্ঞ অভিজ্ঞতা তা মানতে নারাজ।
যে মানুষ তীব্র গ্রীষ্মে ভারী কোট পরে একফোঁটা ঘামে না, যে ছ-মাস একবিন্দু জল বা অন্ন গ্রহণ করে না, যার খালি পায়ের কোনো ছাপ ধুলোয় পড়ে না—সে কি আদৌ কোনো সাধারণ মানুষ হতে পারে? নাকি সে ছিল বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া কোনো অতৃপ্ত আত্মা? কিংবা এই নশ্বর জগতের আড়ালে থাকা কোনো অশরীরী প্রহরী, যে কিছুদিনের জন্য মানুষের রূপ ধরে এসে আমাদের শহরের ওপর নজর রেখে গেল?
লোকটা শারীরিকভাবে উধাও হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার না-থাকাটা যেন এই শহরের বাতাসে এক ভারী, নিঃশব্দ চাপ তৈরি করে রেখে গেছে। আজকাল ভোর চারটে বেজে বারো মিনিট বাজলেই আমি ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াই। রাস্তাটা খাঁ খাঁ করে। কিন্তু অদ্ভুূতময় এক ঠান্ডা বাতাস যখন ঘাড় ছুঁয়ে যায়, আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে। মনে হয়, সে হয়তো চর্মচক্ষুর আড়ালে চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু অদৃশ্য হয়ে আজও এই রাস্তার কোনো এক ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে।
সে কি সত্যিই শুধুই এক হতভাগা ভবঘুরে পাগল, যে হারিয়ে গেছে দূর কোনো অন্ধকারে? নাকি এমন এক অশরীরী সত্তা—যে আজও নিঝুম রাতে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে নজর রাখছে?
এই প্রশ্নের উত্তর কোনোদিন পাওয়া যাবে না। কিন্তু আজকাল গভীর রাতে যখন অন্ধকারে কোনো পদশব্দ পাই, আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে... মনে হয় সে এখনো আমাকে অনুসরণ করছে।
লেখক - আলিম বাবু
About বাংলা গল্পসল্প
Templatesyard is a blogger resources site is a provider of high quality blogger template with premium looking layout and robust design. The main mission of templatesyard is to provide the best quality blogger templates.
Related Posts:
রহস্য গল্প
Labels: photos
অন্যান্য গল্প,
রহস্য গল্প
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment