Wikipedia
Search results
Pageviews
নিচের FOLLOW BUTTON টির দ্বারা আপনি ওয়েবসাইটটি FOLLOW করতে পারেন।
Monday, 24 August 2026
দরজার খিল / 'বাংলা গল্পসল্প' নিবেদিত একখানা রোমাঞ্চকর গল্প।
(১)
রাতের নির্জনতা যখন পুরনো উত্তর কলকাতার ইট-কাঠ-পাথরের বুকে এক ভারী বিষণ্ণতার মতো চেপে বসে, তখন সাধারণ মানুষের জন্য নেমে আসে বিশ্রামের নীরবতা। কিন্তু আমন সেনগুপ্তের কাছে রাত কোনো বিশ্রামের বার্তা আনে না; রাত তার কাছে নিয়ে আসে এক অদৃশ্য, অসীম রণক্ষেত্র—যেখানে প্রতিপক্ষের নাম কোনো রক্তমাংসের মানুষ নয়, তার নিজেরই মগজের কোনো এক বিষাক্ত কোণ।
আজকের রাতটাও আলাদা কিছু নয়। বাইরে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। তিনতলা বাড়ির বারান্দার খড়খড়ি বেয়ে বৃষ্টির ছিটেফোঁটা এসে লাগলে একধরনের স্যাঁতসেঁতে, মেটে গন্ধ ভেসে আসে। আমনের স্টাডি রুমের কোণে থাকা ভারী মেহগনি কাঠের টেবিলটিতে একটা পিতলের টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। ল্যাম্পের ফ্যাকাশে হলুদ আলোয় ঘরের চারপাশের বইয়ের সেলফ আর ছায়াগুলো যেন অদ্ভুত সব রূপকথার জ্যান্ত প্রাণীর মতো দেওয়াল বেয়ে নাচানাচি করছে।
আমনের বয়স এখন পঁয়ত্রিশ। কপালে দুটো গভীর বলিরেখা, চোখের নিচে দীর্ঘদিনের অনিদ্রাজনিত গভীর কালচে ছোপ। কিন্তু তার স্মৃতি তাকে আজ থেকে বিশ বছর পেছনের এক অচেনা অতীতে টান মেরে নিয়ে যায়।
তখন তার বয়স কতই বা হবে? ১৩ কিংবা ১৪ বছর।
পাবনার সেই পুরনো জমিদারি আমলের একতলা বাড়িটার কথা স্পষ্ট মনে পড়ে আমনের। বাড়ির পেছনে ছিল এক প্রকাণ্ড, ঘোলা জলের দিঘি আর তার গা ঘেঁষে ঘন আমবাগান। বর্ষার রাতে ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক আর আমগাছের পাতার খসখস শব্দে এক অদ্ভুত গা-ছমছমে পরিবেশ তৈরি হতো।
সেবার শীতের ঠিক মুখে, এক সাধারণ মঙ্গলবার রাতে ঘটনাটির সূত্রপাত ঘটেছিল।
তার কিছুদিন আগেই আমনের বাবা হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে পুরো বাড়িটায় যেন এক থমথমে অনিশ্চয়তার ছায়া নেমে এসেছিল। আমনের মা রাত হলেই ভয়ে শিহড়ে উঠতেন, বারবার বলতেন, “সংসারে কোনো পুরুষ মানুষ নেই, চোর-ডাকাত ঢুকলে আমরা কোথায় যাব?” এই অবচেতন নিরাপত্তাহীনতার বোধটা খুব নীরবে, আমনের ছোট্ট মগজে এক বিশাল পাথরের মতো চেপে বসেছিল।
সেদিন রাত দশটা নাগাদ পড়াশোনা শেষ করে আমন নিজের ঘরে ঘুমাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মার ভয়ার্ত মুখটার কথা মনে পড়তেই সে বসার ঘরের প্রকাণ্ড কালচে সেগুন কাঠের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। পেতলের ভারী, ঠাণ্ডা খিলটা টেনে মাঝের খাঁজে বসাল। 'খট' করে একটা পরিষ্কার ধাতব শব্দ হলো।
সে নিজের চোখে দেখল, খিলটা সম্পূর্ণ আটকে গেছে। সে আশ্বস্ত হয়ে নিজের ঘরে ফিরে এলো। মশারির ভেতরে ঢুকে বালিশে মাথা রাখল।
ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায়, যখন তার চোখের পাতা দুটো ঘুমের আবেশে ভারী হয়ে আসছিল, হঠাৎ মস্তিষ্কের কোনো এক অজানা প্রকোষ্ঠ থেকে খুব নিচু, কিন্তু ধারালো একটা ফিসফিসানি ভেসে এলো—
“তুই কি সত্যি দরজার খিলটা ঠিকমতো দিয়েছিস? যদি আধ-খোলা থাকে? যদি কোনো অচেনা ছায়া রাতে ঘরে ঢুকে পড়ে আর মায়ের ক্ষতি করে?”
আমন চোখ মেলল। সে মনে মনে নিজেকে বোঝাল—'আমি তো নিজের হাতে লাগালাম। ধাতব শব্দটাও শুনলাম।'
কিন্তু সেই অদৃশ্য কণ্ঠস্বরটি থামল না। সে যেন আরও স্পষ্ট, আরও চাবুকের মতো চেপে বসল তার বুকের ওপর—“তুই মনে করছিস তুই লাগিয়েছিস, কিন্তু খিলটা হয়তো পুরোপুরি খাঁজে বসেনি। শেষ এক সুতো হয়তো রয়ে গেছে। একবার গিয়ে দেখে এলে তোর কী এমন ক্ষতি হবে?”
আমন বিছানায় ছটফট করতে লাগল। এক মিনিট, দুই মিনিট... চারপাশের অন্ধকার যেন তার বুকের ওপর ভারী হয়ে নেমে আসছে। হৃৎপিণ্ডটা পাগলের মতো পিটতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত আর না পেরে সে মশারি তুলে বাইরে এলো। খালি পায়ে, মেঝের ঠাণ্ডা স্পর্শ অনুভব করতে করতে সে বসার ঘরে গেল।
পকেটে থাকা দেশলাই জ্বেলে সে দরজার খিলটার দিকে তাকাল। খিলটা লাগানোই ছিল। সে হাত দিয়ে সেটাকে নাড়ল—হ্যাঁ, সম্পূর্ণ বন্ধ।
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে আবার বিছানায় ফিরল। দেশলাইয়ের কাঠিটা নিভিয়ে মশারির ভেতরে ঢুকতেই সেই একই ফিসফিসানি আবার গর্জে উঠল—
“তুই যখন হাত দিয়ে নাড়ালি, তখন নিজের অজান্তেই খিলটা আলগা করে ফেলিসনি তো? হাত সরানোর সময় টান পড়েনি তো?”
সেদিন রাতে ১৪ বছরের আমনকে মোট চারবার বিছানা ছেড়ে উঠতে হয়েছিল। প্রতিবারই সে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল, কিন্তু প্রতিবারই তার নিজের চোখের দেখা এবং হাতের স্পর্শকে মিথ্যে প্রমাণ করে বিজয়ী হয়েছিল তার ভেতরের সেই একগুঁয়ে সংশয়।
সেদিন সেই বালক বুঝতে পারেনি, তার ভেতরে একটা মনস্তাত্ত্বিক বিকারের বীজ অঙ্কুরিত হয়ে গেছে। সে ভেবেছিল, এটা হয়তো বাবার মৃত্যুর পর তৈরি হওয়া এক সাময়িক আতঙ্ক। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, সেই বীজ তত ডালপালা মেলে এক বিশাল, বিষাক্ত মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
বিশ বছর পর, আজকের আমন সেনগুপ্ত বাংলা সাহিত্য জগতের এক প্রখ্যাত, আভিজাত্যময় নাম। তার মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস, জটিল চরিত্রায়ন আর মানুষের ভেতরের অন্ধকারের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ পাঠকদের মুগ্ধ করে। সাহিত্য সমালোচকেরা বলেন, "আমন সেনগুপ্তের লেখার মধ্যে এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা আর শ্বাসরুদ্ধকর টানটান অনুভূতি থাকে, যা পাঠককে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত মানসিকভাবে বন্দি করে রাখে।"
কিন্তু পাঠক বা সমালোচক কেউ জানে না, এই সাহিত্যিক দক্ষতা কোনো সাধনার ফল নয়; এটি আমনের নিজের প্রতিদিনের যন্ত্রণার নির্যাস। সে যে অনিশ্চয়তার কথা লিখে পাঠকদের চমকে দেয়, সে অনিশ্চয়তার আগুনে সে নিজে প্রতি রাতে তিলে তিলে দগ্ধ হয়।
আমনের এই তিনতলা ফ্ল্যাটটিতে তিনটি বড় দরজা আছে—প্রধান প্রবেশদ্বার, পেছনের বারান্দার দরজা এবং স্টাডি রুমের ফ্রেঞ্চ উইন্ডো। দিনশেষে যখন পুরো কলকাতা শহর স্তব্ধ হয়ে যায়, আমনের কাছে তখন শুরু হয় এক অসীম ও নির্মম কারাদণ্ড।
এখন আর সে স্রেফ চারবার দেখে না। সময়ের সাথে সাথে তার বাতিক বা 'Obsession' এর নিয়ম বদলেছে। বাতিকের নিয়ম হলো—সে একা থাকে না, সে নিজের একটা শৃঙ্খল এবং সংখ্যাতত্ত্ব তৈরি করে নেয়।
আমনের বর্তমান নিয়ম হলো 'সংখ্যা তিন'।
তাকে প্রতিটি দরজার সামনে যেতে হবে।
ডান হাতের তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে পেতলের খিলটা ধরতে হবে।
তিনবার সেটাকে ভেতরের দিকে চাপ দিতে হবে—১, ২, ৩...
প্রতিটি চাপের সাথে মনে মনে উচ্চকণ্ঠে বলতে হবে—“বন্ধ আছে, বন্ধ আছে, বন্ধ আছে।”
এরপর খিল থেকে হাত সরিয়ে তিন পা পিছিয়ে আসতে হবে।
কিন্তু মানুষের মন কত বড় প্রতারক হতে পারে, তা আমন প্রতিদিন টের পায়।
সে যখন তিন পা পিছিয়ে এসে ঘরের দিকে পা বাড়ায়, তখনই তার স্মৃতি তাকে প্রতারণা করতে শুরু করে। সে চিন্তা করে—“আমি যখন ৩ গুনেছিলাম, তখন কি সত্যি তিনবার চাপ দিয়েছিলাম? নাকি দুইবার দেওয়ার পর আমার মন অন্য কোথায় চলে গিয়েছিল? আমি কি সত্যি চোখের দৃষ্টি স্থির রেখেছিলাম, নাকি তখন চোখের পাতা পড়েছিল?”
বাস্তবতা আর কল্পনার সীমা আমনের মস্তিষ্কে আবছা হয়ে যায়। তার মনে হয়, কিছুক্ষণ আগে সে যে খিলটা ছুঁয়ে এলো, সেটা যেন তার নিজের অভিজ্ঞতা নয়—অন্য কারো অভিজ্ঞতা। সে নিজের চোখের দেখাকে বিশ্বাস করতে পারে না। সে নিজের হাতের স্পর্শের অনুভূতিকে বিশ্বাস করতে পারে না।
আমন আবার ফিরে যায় দরজার কাছে। আবার—১, ২, ৩...
একবার, দুইবার, দশবার, পনেরো বার...
ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা থেকে একটার ঘর পার হয়ে দুটোর ঘরে পৌঁছায়। ঘরের মেহগনি কাঠের টেবিলটিতে তার অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি পড়ে থাকে। তার পেনের কালি শুকিয়ে যায়। কিন্তু আমন হাঁটতে থাকে ঘরের মধ্যবিত্ত দূরত্বটুকু জুড়ে। দরজার পেতল থেকে তার মেঝের কার্পেট পর্যন্ত পথটুকু তার কাছে এক অনন্ত নরকপথ।
লেখালেখি আমনের জন্য এক সময় মুক্তির পথ ছিল। সে ভেবেছিল, সে যখন কোনো কাল্পনিক জগতে ডুব দেবে, তখন হয়তো তার ভেতরের এই বাতিকের শৃঙ্খল আলগা হবে। কিন্তু মানসিক বিকার এমন এক পরজীবী, যা মানুষের প্রতিটা ভালো লাগার জিনিসকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নেয়।
আজ বিকেলে সে যখন তার নতুন উপন্যাসের একটা দৃশ্য লিখছিল, সে খেয়াল করল, তার এই বাতিক এখন তার লেখার ভেতরেও থাবা বসিয়েছে।
সে উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের জন্য একটি বাক্য লিখেছিল:
"শুভজিৎ দরজার ভারী খিলটা আটকে দিয়ে অন্ধকার ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। সে জানত, বাইরের পৃথিবীর যাবতীয় ঝড় এখন আর তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।"
এই বাক্যটা লেখার পর আমন থমকে গিয়েছিল। তার হাত কেঁপে উঠেছিল।
সে পেন্সিল দিয়ে বাক্যটার নিচে দাগ দিল। তারপর বাক্যটা আবার পড়ল। আবার পড়ল।
'শুভজিৎ কি সত্যি খিলটা আটকেছিল?'— আমনের মন আবার তাকে প্রশ্ন করল।
সে বাক্যের 'আটকে দিয়ে' শব্দটার ওপর বারবার কলম বুলাতে লাগল, যতক্ষণ না কাগজটা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
সে কেবল দরজার খিল বারবার পরীক্ষা করে শান্ত হয় না; সে এখন নিজের লেখা প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ, এমনকি প্রতিটি কমা এবং পূর্ণচ্ছেদকে বিশ-ত্রিশ বার করে পরীক্ষা না করে পরবর্তী বাক্যে যেতে পারে না। তার উপন্যাস লেখার গতি শ্লথ হয়ে এসেছে। যেখানে এক রাতে সে দশ পাতা লিখে ফেলত, সেখানে এখন সে এক পাতাও শেষ করতে পারে না। সারারাত ধরে সে কেবল আগের লেখা পাঁচটা লাইন সংশোধন করে আর দরজার দিকে হেঁটে যায়।
রাত এখন তিনটা বাজে।
বাইরের বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু জানলার কাঁচ বেয়ে জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ার শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। আমনের শরীরের প্রতিটা পেশি ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে। তার মাথা ঝিমঝিম করছে, চোখের পেছনে এক তীব্র যন্ত্রণা অনুভবে আসছে। দীর্ঘ অনিদ্রা তার স্নায়ুগুলোকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে।
সে বাথরুমের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বেসিনের ঠান্ডা জল দিয়ে মুখে ঝাপটা দিল।
আয়নায় ভেসে ওঠা নিজের চেহারার দিকে তাকিয়ে আমন নিজেই শিহরে উঠল। এ কোন মানুষ? উস্কোখুস্কো চুল, শুকনো ঠোঁট, আর চোখের মনি দুটো যেন কোটর ছেড়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তার আঙুলের ডগাগুলো লাল হয়ে ফুলে গেছে—সারারাত ধরে দরজার পেতলের খিলে ঘষা খেতে খেতে চামড়া ছাল উঠে গেছে।
আমন আয়নার দিকে আঙুল উঁচিয়ে ফিসফিস করে কেঁদে উঠল, “আমি তো বন্ধ করেছি! আমি নিজে হাতে খিলটা টেনেছি! আমি তো পাগল নই! তবে কেন? কেন আমি নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছি না? আমার নিজের স্মৃতির ওপর আমার কেন কোনো অধিকার নেই?”
আয়নার প্রতিবিম্ব তাকে কোনো উত্তর দিল না। উত্তর দেওয়ার কেউ নেই।
আমন বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো। সে স্থির করল, আজ সে আর দরজার দিকে তাকাবে না। সে জোর করে নিজের বিছানায় গিয়ে শুল। বালিশটা মাথার ওপর চেপে ধরে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করল। সে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগল।
কিন্তু এক মিনিট পার হতে না হতেই, ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ভারী সেগুন কাঠের দরজাটা যেন এক জ্যান্ত হিংস্র প্রাণীর মতো নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করল। আমন বন্ধ চোখের ভেতরেও দেখতে পেল—সেই দরজার খিলটা যেন ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যাচ্ছে। যেন কোনো এক অদৃশ্য হাত খিলটাকে সরিয়ে দিচ্ছে...
আমনের বুকের ভেতর হৎস্পন্দন বাড়ে। কপালে ঘাম জমে ওঠে। সে নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।
সে বিছানা থেকে ছিটকে উঠে দাঁড়ায়। আবার অন্ধকারের দিকে পা বাড়ায়। তার হাত দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রসারিত হয় দরজার খিলের দিকে...
রাত তখন সাড়ে চারটে। পূর্বাকাশে আলোর কোনো চিহ্ন নেই। কেবল একজন পরাজিত লেখক আর তার অধরা বিশ্বাসের লড়াই মাঝরাতে নিঃশব্দে চলতে থাকে।
(২)
সময় নদীর মতো বয়ে চলে, কিন্তু আমন সেনগুপ্তের জীবনে সময় এসে থমকে গেছে তার ঘরের ওই পেতলের খিলগুলোর মুখে। দিন এবং রাতের পার্থক্যে আমনের আর কিছু আসে যায় না। তার জগত এখন সংকুচিত হতে হতে একটি চারকোনা ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে, যার চারপাশে ঘুরে বেড়ায় চারটে দরজার বিভীষিকা।
বয়সের হিসাব হয়তো ক্যালেন্ডারে জমে উঠছে, কিন্তু আমনের কাছে সময়ের একমাত্র একক হলো—বাধ্যবাধকতা। বাতিক বা OCD (Obsession) কখনো একই জায়গায় স্থির থাকে না। সে একটা পরজীবীর মতো, রোগীকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে এবং নিজের শিকড় গভীরে ছড়ায়।
আমনের জীবনের 'সংখ্যা তিন'-এর সেই পুরনো শৃঙ্খল ভেঙে গেছে। তিনবার দেখে এখন আর তার মন সান্ত্বনা পায় না। সেই অতিপরিচিত অদৃশ্য কণ্ঠস্বর এখন আরও বেশি শক্তিশালী, আরও বেশি দাবিদার।
“তিন সংখ্যাটা অশুভ। তিনবারে খিল আটকে রাখা যায় না। তোকে সাতবার দেখতে হবে। না, সাতবার নয়... একুশ বার!”
হ্যাঁ, এখন একুশ।
আমনের নতুন জীবনপদ্ধতি এখন এক বিকৃত গণিতের রূপ নিয়েছে। রাতে শোবার আগে প্রতিটি দরজার সামনে তাকে দাঁড়াতে হয়। একুশ বার ধাতব খিলটাকে ধরে জোরে চাপ দিতে হয়। একুশ বার শব্দ করে গুনতে হয়।
“এক... দুই... তিন... চার...”
প্রতিটি গণনার সাথে তার হৃৎপিণ্ডের গতি বাড়ে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় উনিশ বা বিশ নম্বরে পৌঁছে। আমনের মন তাকে বলে—“তুই যখন সতেরো নম্বর বললি, তখন কি তোর মন সজাগ ছিল? নাকি তুই পনেরোর পর সোজা সতেরোয় চলে গেছিস? মাঝের ষোলো নম্বরটা কোথায় গেল?”
যদি একমুহূর্তের জন্যও দ্বিধা তৈরি হয়, তবে পুরো নিয়ম ভেস্তে যায়। সে আবার শুরু থেকে গণনা শুরু করে। ১, ২, ৩...
কখনো কখনো একুশে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমনের চার ঘণ্টা সময় কেটে যায়। সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, তার হাঁটু দুটো কাঁপতে থাকে। বার বারবার ধাতব খিল টেনে টেনে তার হাত থেকে চামড়া উঠে রক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। পেতলের খিলের গায়ে লেগে থাকে শুকনো রক্তের লালচে দাগ। কিন্তু তার কোনো খেয়াল নেই। তার পুরো অস্তিত্ব তখন সমর্পিত হয়েছে ওই একটা প্রশ্নের কাছে—খিলটা কি সত্যি বন্ধ?
বাইরের জগত আমনকে অন্যভাবে চেনে। তার সাহিত্যিক খ্যাতি এখন মধ্যগগনে। পাঠকমহলে হইচই পড়ে গেছে তার নতুন মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসটি নিয়ে। সাহিত্য পুরস্কারের জন্য তার নাম মনোনীত হয়েছে। বিভিন্ন পত্রিকা তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
কিন্তু আমন ঘরের বাইরে যায় না। সে সাক্ষাৎকার দেয় না। বাইরে যাওয়া মানেই তো ফিরে এসে আবার চারটে দরজার খিল একুশ বার করে পরীক্ষা করা! এই মানসিক আর শারীরিক নির্যাতন সহ্য করার ক্ষমতা তার আর নেই। তাই সে নিজেকে ঘরের ভেতর বন্দী করে ফেলেছে।
পাবলিশার সুরেশবাবু একদিন নিজে এসে আমনের দরজায় কড়া নেড়েছিলেন।
“আমন, তুমি নতুন লেখাটা শেষ করছ না কেন? পাঠকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তোমার লেখা তো বাংলা সাহিত্যে বিপ্লব ঘটিয়ে দিচ্ছে! মানুষ বলছে, তুমি মানসিক অস্থিরতাকে যেভাবে ফুটিয়ে তোল, তা নাকি ঈশ্বরপ্রদত্ত দক্ষতা!”
ভেতর থেকে আমন দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে কাঠের গায়ে হাত দিয়ে শুষ্ক গলায় বলেছিল, “সুরেশদা, আমি লিখছি। কিন্তু শেষ করতে পারছি না। প্রতিটা বাক্যের শেষে এসে আমার মনে হয়, শব্দটা ভুল লেখা হলো। আমি পেছনের পাতায় ফিরে যাই। আমি এগোতে পারছি না।”
সুরেশবাবু হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “ওটা লেখকদের নিখুঁত হওয়ার রোগ! তুমি বেশি চিন্তা কোরো না। দ্রুত শেষ করো।”
সুরেশবাবু জানেন না, এটা নিখুঁত হওয়ার রোগ নয়। এটা এক আদিম, নরকতুল্য মানসিক বন্দিদশা।
সেদিন রাতে আমন তার স্টাডি রুমে বসেছিল। সে সিদ্ধান্ত নিল, সে আজ নিজেকে এই বাতিকের হাত থেকে মুক্ত করবে। সে আর দরজায় হাত দেবে না।
সে টেবিলের ওপর একটা পেন্সিল আর কাগজ রাখল। সে ঠিক করল, যখন সে দরজার খিলটা লাগাবে, সে কাগজের ওপর একটা করে দাগ টানবে। চোখের দেখা বা হাতের স্পর্শকে সে বিশ্বাস করতে পারছে না, তাই সে কাগজ আর কালির এই বাস্তব প্রমাণকে আঁকড়ে ধরতে চাইল।
রাত বারোটা। আমন প্রথম দরজার কাছে গেল। খিলটা মারল। কাগজে একটা কালো দাগ কাটল—'১'।
আবার খিলটা টানল। দাগ কাটল—'২'।
এভাবে একুশটা দাগ কাটার পর সে কাগজের দিকে তাকাল। দেওয়ালে আর কাগজে একুশটি স্পষ্ট দাগ ভেসে উঠেছে। আমন স্বস্তির হাসি হাসল। সে ভাবল, এবার তো প্রমাণ রয়েছে! কাগজ তো মিথ্যা বলবে না!
সে কাগজের পাতাটা টেবিলের ওপর রেখে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
কিন্তু মানুষের মানসিক বিকার এতটাই চতুর যে, সে যেকোনো যুক্তিকে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে। অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকার দশ মিনিটের মাথায় আমনের মাথায় নতুন এক বিষাক্ত চিন্তা ছড়িয়ে পড়ল—
“তুই কাগজে একুশটা দাগ কেটেছিস ঠিকই। কিন্তু তুই কি খিলটা টানার সময়ই দাগটা কেটেছিলি? এমনও তো হতে পারে, তুই কেবল কাগজে দাগ কেটে গেছিস, আর তোর অন্য হাত দরজার খিল পর্যন্ত পৌঁছায়নি? কাগজ তো প্রমাণ করে তুই দাগ কেটেছিস, কিন্তু খিল যে বন্ধ হয়েছে, তার প্রমাণ কোথায়?”
আমন বিছানায় সোজা হয়ে বসে পড়ল। তার কপাল থেকে ঠাণ্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। সে দুই হাতে নিজের চুল খামচে ধরল।
“না! না! আমি খিল নাড়িয়েছি! আমি নিজের চোখে দেখেছি!” আমন অন্ধকারের মধ্যে চিৎকার করে উঠল।
কিন্তু ভেতরের সেই শয়তান হাসতে লাগল—“তুই যা দেখেছিস, তা তোর মনের ভুলও তো হতে পারে? আর একবার গিয়ে দেখে আয় না... কেবল আর একবার!”
আমন বিছানা ছেড়ে ছিটকে নামল। তার আর ধৈর্যের বাঁধ রইল না। সে দেওয়ালের দিকে তাকাল। কাগজের ওই দাগগুলো যেন তাকে দেখে ব্যঙ্গ করছে। সে পাগলের মতো কাগজটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে বাতাসে উড়িয়ে দিল।
তারপর সে ধেয়ে গেল দরজার দিকে। এবার আর কোনো সংখ্যা নয়, কোনো গণনা নয়। সে উন্মাদের মতো দুটো হাতে দরজার পেতলের খিলটা ধরে ঝাঁকাতে লাগল।
খট-খট-খট-খট-খট!
রাতের নিঝুম অন্ধকারে সেই বিকট শৃঙ্খলের শব্দ চারপাশের দেওয়ালে প্রতিধ্বনি তুলতে লাগল। আমন গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে খিলটা টানছে, ছাড়ছে, আবার টানছে। তার হাত কেটে রক্ত গড়িয়ে কাঠের ওপর পড়ছে। তার নিঃশ্বাস ঝড়ের মতো বইছে।
“বন্ধ থাক! তোকে বন্ধ থাকতেই হবে! তুই কেন আমাকে মুক্ত করছিস না?” সে চিৎকার করে দরজার কাঠের ওপর নিজের কপাল ঠুকতে লাগল।
সে কেবল দরজার খিল ঝাঁকাচ্ছিল না, সে যেন নিজের মস্তিষ্কের খুলিটাকে ভেঙে ভেতরের সেই অদৃশ্য রাক্ষসটাকে বের করে আনার চেষ্টা করছিল।
রাত গড়িয়ে ভোর হতে চলল। আমন দরজার গোড়ায় মেঝের ওপর এলিয়ে পড়ে রইল। তার হাত দুটো রক্তে লাল, চোখ দুটো খোলা, অপলক। সে তাকিয়ে আছে দরজার পেতলের খিলটার দিকে। ভোরের আলো এসে পড়েছে পেতলের ওপর।
খিলটা বন্ধই রয়েছে। কিন্তু আমনের মনের ভেতর যে দরজাটা ভেঙে গেছে, তা আর কোনোদিন বন্ধ করা যাবে না। সে টের পেল, সে ধীরে ধীরে তার জীবনের শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে।
(৩)
পর পর তিন দিন ধরে আমন সেনগুপ্তের ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে কোনো আলো জ্বলেনি। দরজার গোড়ায় খবরের কাগজগুলো জমে পাহাড় হয়ে উঠেছে।
প্রকাশক সুরেশবাবু আর আমনের এক বাল্যবন্ধু, ডাক্তার অনির্বাণ, আমনের ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমন গত তিনদিন ধরে কারো ফোন ধরেনি। তার নতুন বইয়ের মেলা শুরু হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি, কিন্তু লেখক নিখোঁজ।
“আমার কেন যেন ভালো ঠেকছে না, অনির্বাণ,” সুরেশবাবু উদ্বিগ্ন গলায় বললেন। “আমন ইদানীং খুব অদ্ভুত কথা বলছিল। ওর চোখমুখ দেখে মনে হতো ও যেন কোনো গভীর আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে।”
ডাক্তার অনির্বাণ দরজায় হাত দিয়ে ধাক্কা দিলেন। “আমন! আমন! দরজা খোল! ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই কেন?”
তারা দরজায় কান পাতলেন। ভেতরের নীরবতা যেন এক শ্মশানের স্তব্ধতা। কোনো সাড়াশব্দ নেই, কোনো চলাফেরার শব্দ নেই।
দুশ্চিন্তা বাড়তেই পাড়ার লোকজনকে ডাকা হলো। স্থানীয় থানার পুলিশকেও খবর দেওয়া হলো। অবশেষে একজন ছুতোর মিস্ত্রি ডেকে দরজার ভারী লক এবং খিল কাটার ব্যবস্থা করা হলো।
ভারী হাতুড়ির ঘা পড়তে লাগল কাঠের দরজায়। বাং! বাং!
ভেতরের সেই কাঠের দরজা, যে দরজাকে আগলে রাখার জন্য আমন তার জীবনের সমস্ত ঘুম, শান্তি আর মানসিক ভারসাম্য বিসর্জন দিয়েছিল—আজ সেই দরজাই বাইরের মানুষের আঘাতে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
বিকেল চারটে নাগাদ প্রকাণ্ড এক ধাক্কায় প্রধান দরজাটা ভেঙে ভেতরে পড়ে গেল।
ভেতরে পা রাখতেই ঘরের ভেতরের পরিবেশ দেখে উপস্থিত প্রতিটি মানুষ স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ঘরের ভেতরে কোথাও কোনো আসবাবপত্র গুছিয়ে রাখা নেই। মেঝের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে লাখ লাখ পাণ্ডুলিপির পাতা। আর ঘরের দেওয়ালগুলো...
সাদা প্লাস্টারের দেওয়াল বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। চারপাশের প্রতিটা দেওয়ালে, মেঝের কার্পেটে, এমনকি সিলিংয়ের গায়ে পেন্সিল, কলম, মেটালের চাবি আর রক্তের দাগ দিয়ে আঁকা হয়েছে হাজার হাজার, লাখ লাখ গাণিতিক হিসাব এবং সোজা দাগ।
প্রতিটি দাগের পাশে অত্যন্ত ছোট ছোট অক্ষরে একই কথা লেখা—
“১, ২, ৩... ২১। বন্ধ? বন্ধ? বন্ধ? সত্যি বন্ধ তো?”
সমগ্র ফ্ল্যাটটা যেন একটি বিশাল, অন্ধকার গাণিতিক খাঁচায় পরিণত হয়েছে। সেখানে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে রক্ত আর পুরনো কাগজের গন্ধে।
আর আমন?
আমন বসে আছে ঘরের একদম মাঝখানে, মেঝেতে পদ্মাসন হয়ে। তার পরনে একটা ধূসর রঙের সাধারণ জামা। তার দু-হাতের দশটি আঙুলের নখ উপড়ে গেছে, হাতের তালু আর আঙুলের চামড়া ক্ষতবিকল্পিত হয়ে শুকিয়ে কালচে রক্তে ঢেকে গেছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো আমনের মুখমণ্ডল।
যে আমনকে শেষ কয়েক বছর ধরে তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখা গেছে, যার চোখে সর্বদা বিরাজ করত এক তাড়া করা আতঙ্ক—আজ তার মুখে সেই যন্ত্রণার কোনো চিহ্ন নেই।
তার মুখে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য এবং চরম ভয়াল প্রশান্তি।
তার চোখের নিচে কালি নেই, তার মুখে কোনো উদ্বেগের বলিরেখা নেই। সে স্থির, অচঞ্চল। যেন সে বহু বছরের ক্লান্তিকর কোনো এক যুদ্ধ জয় করে ফিরে এসেছে।
তার কোলের ওপর খোলা রয়েছে তার শেষ উপন্যাসের শেষ পাতাটি। সেখানে তার নিজের রক্ত দিয়ে একটা বড় বাক্য লেখা রয়েছে:
"আমি আজ দরজার খিল বন্ধ করার পরীক্ষা ছেড়ে দিয়েছি। কারণ আমি পরম সত্য উপলব্ধি করতে পেরেছি—যা কিছু বাইরের হিংস্রতা ছিল, তা বহু আগেই আমার ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আর আমার ভেতরের যা কিছু মানবতা, শান্তি আর বিশ্বাস ছিল—তা বহু আগে খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে পালিয়ে গেছে।
এখন খিলটা বন্ধ রইল কি খোলা... ঘর আর খাঁচার মধ্যে তো কোনো পার্থক্য নেই। যে নিজের মনকে বিশ্বাস করতে পারে না, তার কাছে পুরো পৃথিবীটাই একটা খোলা জেলখানা। আমি আজ আমার মনটাকেই চিরকালের মতো খিল এঁটে বন্ধ করে দিলাম।"
ডাক্তার অনির্বাণ ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে আমনের পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেন। তিনি কেঁপে উঠে আমনের কাঁধে হাত দিলেন।
“আমন... আমন তুই শুনতে পাচ্ছিস?”
আমন ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখের মনি দুটোর দিকে তাকিয়ে অনির্বাণ শিউরে উঠলেন। সেই চোখে কোনো জীবন নেই, কোনো পরিচয় নেই, কোনো স্মৃতি নেই। সেখানে কেবল বিরাজ করছে এক অনন্ত, অন্ধকার অসীম শূন্যতা। আমন আর এই বাস্তব জগতে নেই। সে নিজের মনের ভেতরে এমন এক গভীর চিলেকোঠায় প্রবেশ করেছে, যার চাবি সে নিজেই হারিয়ে ফেলেছে।
আমন অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে খুব মৃদু, সুন্দর একটা হাসি হাসল। তারপর আঙুল দিয়ে ঠোঁটে চাপ দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আস্তে... একদম শব্দ করবেন না। আমি এইমাত্র ঘরের আর মনের সবকটা খিল একুশ বার করে পরীক্ষা করে এলাম। এবার একদম নিশ্চিত... খাঁচার ভেতরের লোকটা আর কোনোদিন বাইরে বেরোতে পারবে না। দরজা পুরোপুরি বন্ধ।”
সুরেশবাবুর হাত থেকে পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো মেঝেতে খসে পড়ল।
বাইরের ভাঙা দরজার ওপার থেকে বিকালের শেষ লাল আলো এসে পড়েছিল আমনের রক্তমাখা হাত দুটোর ওপর। কিন্তু আমন সেনগুপ্ত নামক সেই মহান লেখক ততক্ষণে নিজেরই তৈরি সংশয়ের এক চিরন্তন খাঁচায় বন্দি হয়ে গেছেন—যে খাঁচা থেকে বেরোনোর আর কোনো খিল নেই, আর কোনো দরজা নেই, আর কোনো ফিরতি পথ নেই।
(সমাপ্ত)
লেখক - আলীম বাবু
Tags
# অন্যান্য গল্প
About বাংলা গল্পসল্প
Templatesyard is a blogger resources site is a provider of high quality blogger template with premium looking layout and robust design. The main mission of templatesyard is to provide the best quality blogger templates.
Related Posts:
অন্যান্য গল্প
Labels: photos
অন্যান্য গল্প
Subscribe to:
Post Comments (Atom)


No comments:
Post a Comment